ছোটবেলায় কাশি কিংবা ঠাণ্ডা হলে অধিকাংশ মানুষেরই ভরসা ছিল গাঢ় নীল রংয়ের একটি কৌটায়। যার ক্যাপটি ছিল ফিরোজা রংয়ের। এটি ছিল মেনথল মিশ্রিত মলম।
এক শতাব্দির বেশি সময়ের মধ্যে এর ব্যবহার একটি মহাদেশকে ছাপিয়ে সর্বোত্র ছড়িয়ে পড়ে। যার ঘরোয়া নাম দেয়া হয় ভিক্স ভ্যাপোরাব। এটির নামকরণের পেছনে রয়েছে একটি স্প্যানিশ মহামারি। ২০ শতকের দিকে এই মহামারি ছড়িয়ে পড়েছিল। মূলত একজন বাবার পরম মমতাই এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৮৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পূবাঞ্চলীয় রাজ্য উত্তর ক্যারোলিনাতে ফার্মাসিস্ট লান্সফোর্ড রিচার্ডসনের ৯ বছর বয়সী শিশু কাশিতে আক্রান্ত হয়। এটি শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ হওয়ায় যখনই কাশি আসত তখন বিরক্তিকর এক শব্দ তৈরি হত।
ছেলের চিকিৎসার উপায় খুঁজে না পেয়ে রিচার্ডসন তার ফার্মেসিতে সুগন্ধি তেল ও বিভিন্ন রাসায়নিক মিশিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত এমন এক মলম তৈরি করেন যা তার ছেলেকে স্বস্তি দেয়। কিন্তু তখনও এটি ভিক্স ভ্যাপোরাব নামে পরিচিত লাভ করেনি।

রিচার্ডসন যখন দেখলেন তার ছেলে জন্য এটি বেশ উপশম, তখন তিনি এটি মাত্র ২৫ সেন্টে বিক্রি করা শুরু করলেন। ছোট্ট একটি কৌটায় করে তিনি এটি বিতরণ করা শুরু করলেন। ঝাঁঝালো গন্ধযুক্ত এ পণ্যটি তৈরি হয়েছিল মেনথল, কর্পূর, ইউক্যালিপটাস এবং আরও কয়েক ধরনের তেলের মিশ্রণে। যা রাখা হতো পেট্রোলিয়াম জেলির মতো করে। এই মলমটি নাক আটকে যাওয়া সমস্যা দূর করত এবং বুকে মালিশ করলে এর ঝাঁঝ কাশি কমিয়ে ফেলত।
প্রথমে রিচার্ডসন তার তৈরি মিশ্রণটির নাম দেন ‘ভিক’স ক্রুপ অ্যান্ড নিউমোনিয়া স্যালভ’। একজন আগ্রহী উদ্যানমালিক হিসেবে তিনি ভিক্স গাছের বিজ্ঞাপন দেখে এই নামটি নির্বাচন করেন। এ গাছের পাতা চূর্ণ করলে মেনথলের মতো গন্ধ বের হয়।
এছাড়া তিনি নামটি নির্বাচন করার জন্য তার শ্যালক ডা. জোশুয়া ভিকের সহযোগিতা নেন। তিনি গ্রিন্সবোরো শহরে একজন বিশ্বস্ত চিকিৎসক ছিলেন। রিচার্ডসনের বিশ্বাস ছিল, ‘ভিক’ শব্দটি ছোট, সহজে মনে রাখা যায় এবং লেবেলে দেখতে ভালো লাগে।
ম্যাজিক স্যালব থেকে ভ্যাপোরাব
১৯১১ সালে অর্থাৎ স্যালভ তৈরির ১৭ বছর পর, পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব নেন রিচার্ডসনের ছেলে হেনরি স্মিথ। যিনি একসময় সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তিনি পণ্যের নাম পরিবর্তন করে ‘ভিক’স ম্যাজিক ক্রুপ স্যালভ’ থেকে ‘ভিক’স ভ্যাপোরাব স্যালভ’ রাখেন। এই নামে এটি ১৯০৫ সাল থেকে বিক্রি হচ্ছিল।
পরিবর্তন আনা হয় প্যাকেজিংয়েও। স্বচ্ছ কাচের বোতল থেকে এনে এটি বিশেষ কোবাল্ট নীল কৌটায় বিক্রি শুরু হয়।
এর মধ্যে রিচার্ডসন একাধিক রোগের জন্য আরও ২১টি ওষুধ তৈরি করেন। এর মধ্যে ছিল কোষ্ঠকাঠিন্য ও দুর্বল যকৃতের জন্য “ভিক’স লিটল লিভার পিলস”; মচকানো, ঘা ও বাতের ব্যথার জন্য “টার্টল অয়েল লিনিমেন্ট”; “রক্তের সমস্যা” দূর করার জন্য “টার হিল সার্সাপারিলা” এবং ফ্লুর চিকিৎসার জন্য “গ্রিপ নকার্স”।

এসব তিনি বিক্রি করতেন ভিক’স ফ্যামিলি রেমেডিজ কোম্পানি-এর মাধ্যমে, যা তিনি ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু এসবের কোনোটিই তার তৈরি মূল স্যালভের মতো জনপ্রিয়তা পায়নি।
পরবর্তীতে ১৯১১ সালে হেনরি বাকী সব পণ্য বন্ধ করে দেন, ব্যবসার নাম বদলে রাখেন ভিক কেমিক্যাল কোম্পানি এবং একমাত্র তাদের স্বাক্ষর পণ্যটির বিপণন ও বিতরণে মনোযোগ দিতে শুরু করেন।
কোম্পানি তখন বিপুল পরিমাণ বিনামূল্যে নমুনা বিতরণ শুরু করে। বিক্রয়কর্মীরা ট্রামগাড়িতে বিজ্ঞাপন টাঙাতেন এবং ফার্মাসিস্টদের কাছে যেতেন। তাদের পণ্যটি ব্যবহার করতে উৎসাহিত করতেন।
স্প্যানিশ ফ্লুর সময় বিপণন
সাত বছর পর ১৯১৮ সালে, আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মহামারি বিশ্বজুড়ে তাণ্ডব চালায়। স্প্যানিশ ফ্লু প্রায় ৫ কোটি মানুষের প্রাণ নেয়। করোনা মহামারি মৃত্যুর চেয়ে আটগুণ বেশি।এই সময়েই ভিক’স ভেপোরাব বিক্রি বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।
এটির সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল এলি’স ক্রিম বাম… যা ছিল মূল পণ্যের অনুকরণ, তবে এর তেমন জনপ্রিয়তা ছিল না। বিষয়টি প্যানডেমিক ১৯১৮ বই এর লেখে ক্যাথারিন আর্নল্ড।
‘স্প্যানিশ ফ্লু ছিল একটি অস্বাভাবিক অটোইমিউন ভাইরাস, যা সবচেয়ে কম বয়সী ও সুস্থ ব্যক্তিদের আক্রান্ত করত এবং অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করত। যেমন- ভয়াবহ রক্তক্ষরণ এবং হেলিওট্রোপ সায়ানোসিসের মতো উপসর্গ দেখা দিত। এতে মানুষের ত্বক নীল হয়ে যেত।
যেভাবে ঘরোয়া নাম তৈরি হয়
বিক্রি আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে এবং ১৯১৮ সালের অক্টোবর মাসে মহামারির শুরু থেকে সাত মাস পর— ভিক কেমিক্যাল কোম্পানি ফার্মাসিস্টদের জানায় যে বিশাল চাহিদার কারণে তাদের অতিরিক্ত স্টক সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেছে। চার মাস চলার মতো সরবরাহ তিন সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
ওই সময়ের সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, কোম্পানি এক সপ্তাহে ১.৭৫ মিলিয়ন ভ্যাপোরাব কৌটার অর্ডার পেয়েছিল এবং ব্যবসার দৈনিক আয় ছিল প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৯২ ডলার। কৌটাগুলো তিনটি মাপে পাওয়া যেত, যার দাম ছিল ৩০ সেন্ট, ৬০ সেন্ট এবং ১.২০ সেন্ট।
১৩০ বছরেরও বেশি সময় পর ভিক্স ভ্যাপোরাব বিক্রি হচ্ছে পাঁচটি মহাদেশের প্রায় ৭০টি দেশে। প্রতি বছর এর ৩.৭৮ মিলিয়নেরও বেশি লিটার (প্রায় ১ মিলিয়ন গ্যালনের বেশি) উৎপাদন হচ্ছে। এর মালিক প্রোক্টার অ্যান্ড গ্যাম্বল এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে এক বিলিয়নেরও বেশি ইউনিট বিক্রি হয়েছে।
