নিজস্ব প্রতিবেদক :: আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সরকারি দল ও বিরোধীদের লড়াইয়ের বড় ক্ষেত্র হবে সাইবার জগৎ। দেশের প্রায় ১৩ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীকে সামনে রেখে প্রস্তুত হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। দলীয় ইতিবাচক প্রচারের পাশাপাশি বিরোধীদের নেতিবাচক প্রচারণা রুখে দেওয়াই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। এজন্য নির্বাচনের অনেক আগেই শক্তিশালী সাইবার টিম গঠনে কাজ শুরু করেছেন তারা।
আওয়ামী লীগ প্রতিটি জেলায় ইন্টারনেট ব্যবহারে দক্ষ এমন ১০০ সদস্যের টিম গঠনে কাজ করছে। আর বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলো দেশ ও দেশের বাইরে থেকে প্রচার-প্রচারণার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। উভয়ের ব্যাপক প্রস্তুতির ফলে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে সাইবার দুনিয়া।
এ অবস্থা মোকাবিলায় প্রস্তুত হচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ তদারক সংস্থাগুলো। সাইবার নজরদারি বাড়াতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আনতেও কাজ করছেন তারা। গতি এসেছে সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের আলোচনায়। ২১২১ জনবল নিয়ে গঠিত হচ্ছে বিশেষায়িত ও স্বতন্ত্র এ ইউনিট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচন এলেই ডালপালা মেলে গুজব। নিজের সক্ষমতা ও অন্যের অক্ষমতা প্রচারে ব্যস্ত হয় প্রার্থী ও দল। শুরু হয় সাফল্য-ব্যর্থতা জানান দেওয়ার লড়াই। অনলাইন মাধ্যমে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সেই ঝুঁকি বেড়েছে। আগে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতাদর্শীরা ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে নিজেদের কথা প্রচারে অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করতেন।
এবার সেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে দলগতভাবে। দেশের বাইরে থেকেও চলছে প্রচার-প্রচারণা, যা দেশের অনলাইন তদারক কর্তৃপক্ষের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগ বলছে, মাঠের রাজনীতিতে পেরে উঠতে না পেরে বিএনপি-জামায়াত অনলাইন প্ল্যাটফরমগুলোকে গুজব ও প্রোপাগান্ডার মাধ্যম হিসাবে বেছে নিয়েছে। প্রতিরোধে সক্রিয় রয়েছে তারাও।
অন্যদিকে বিএনপি বলছে, বর্তমান ব্যবস্থায় তারা নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সামাজিক মাধ্যমসহ অনলাইন প্ল্যাটফরমে তারা সক্রিয় আছে। কিন্তু সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে সেখানেও দমন-পীড়ন করছে। এছাড়া জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ অন্য দলগুলোও অনলাইনভিত্তিক প্রচারে মনোযোগী হয়েছে।
জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার শনিবার বলেন, নির্বাচনকে ঘিরে সাইবার জগতে বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা চালানোর আশঙ্কা রয়েছে। এটা মাথায় রেখে আমরাও সেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি। নির্বাচনকে হালকাভাবে দেখছি না। আমি বরাবরই বিশ্বাস করি, ম্যানুয়ালি সবকিছু করা সম্ভব নয়। দেশে এখন পাঁচ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছেন।
এত সংখ্যক ব্যবহারকারী দ্বারা সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে অবশ্যই প্রযুক্তি লাগবে। যতটুকু পেরেছি প্রযুক্তি নেওয়া হয়েছে। আরও যা প্রয়োজন তা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, কার্যকরভাবে এখন পর্যন্ত আমাদের প্রযুক্তি ম্যানুয়াল। স্বয়ংক্রিয় বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কাজ করার মতো প্রযুক্তি এখনো সেভাবে আসেনি। সে কারণে আমাদের হয়তো কিছুটা দুর্বলতা রয়ে গেছে।
তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি সাইবার মনিটরিংয়ের জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে। মনিটরিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ব্যবহারের প্রস্তাব আমাদের আছে। পাশাপাশি আমরা চেষ্টা করছি ফেসবুককে জিজ্ঞাসা না করেই যাতে অসামঞ্জস্যপূর্ণ লিংকগুলো বন্ধ করা যায়। এজন্য আমাদের প্রজেক্ট পাশ করা আছে। আমরা এখন প্রযুক্তি খুঁজছি।
আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, অনলাইনে সরকারের উন্নয়ন প্রচার, অন্যদের অপপ্রচার ও গুজব রুখে দিতে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরিতে কাজ করছে তারা। এজন্য দলটির প্রচার ও প্রকাশনা উপকমিটি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপকমিটি এবং দলের গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) একযোগে কাজ করছে।
ইতোমধ্যে প্রচার ও প্রকাশনা উপকমিটির থেকে প্রতিটি আসনে ১০০ জন করে অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট তৈরিতে কাজ শুরু হয়েছে। এজন্য দলীয় এমপিদের চিঠিও পাঠানো হয়। অন্যদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপকমিটি কর্মীদের অনলাইনে দক্ষ করে তুলতে কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। আর সিআরআই বিভিন্ন দিবস ও ইস্যুভিত্তিক কনটেন্ট তৈরিতে কাজ করছে। সেগুলো নেতাকর্মী ও অনুসারীদের মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
প্রযুক্তিতে দক্ষ ও তরুণ দুই সংসদ-সদস্য এবং আরও দুই কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা কাজগুলোর সমন্বয় করছেন। এতে যুক্ত করা হয়েছে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের তরুণ এবং দক্ষ কর্মীদের। তারা আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘিরে অনলাইন প্রচারণা নিয়ে কয়েক দফায় বৈঠকও করেছেন।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুস সবুর বলেন, ২০০৮ সালের পর থেকেই বিএনপি-জামায়াতের অনলাইনে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো বেড়েছে। মাঠ দখলে না থাকায় অনলাইনে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ইদানীং দেশের বাইরে থেকে এটা বেশি করা হচ্ছে। তাদের রুখে দিতে আমরা প্রস্তুত আছি। দেশব্যাপী গুজব ও অপপ্রচার রুখে দিতে নেতাকর্মীরা কাজ করছে।
অন্যদিকে বিএনপি প্রচার-প্রচারণায় গতি আনতে ১০ সদস্যের মিডিয়া সেল গঠন করেছে। এই সেল গঠনের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের তৎপরতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কোনো ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে কনটেন্ট তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করছেন তারা। পাশাপাশি দলীয় কর্মসূচি ও বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনাগুলোর ভিডিও ও স্থিরচিত্রও ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
জানতে চাইলে বিএনপির সাবেক সংসদ-সদস্য ও মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, আওয়ামী লীগ অনলাইনে প্রচার-প্রচারণায় অর্থ খরচ করে লোকবল নিয়োগ দিয়েছে। অপরদিকে আমাদের প্রচার-প্রচারণায় তারা নানা ধরনের বাধা তৈরি করছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে বিএনপির অনলাইন প্রচারণাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে সরকার। ফলে নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে আমাদের কাজ করতে হচ্ছে। এরপরও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন যেসব নেতাকর্মী স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজে আগ্রহী, তাদের নিয়ে আমাদের কাজ চলছে।
এদিকে দলগুলো এবং তাদের নেতাকর্মীদের নামে থাকা সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্টের বাইরে বেনামি বিভিন্ন উসকানিমূলক পোস্টও দেখা যাচ্ছে সামাজিক মাধ্যমগুলোয়। সেসব পোস্ট আবার টাকা খরচ করে বিজ্ঞাপন আকারে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেগুলোর উৎস খুঁজতেও কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সাইবার অপরাধে বিস্তৃতির ফলে পুলিশের এ সংক্রান্ত কাজের কর্মপরিধিও বেড়েছে। সে কারণেই বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে একটি বিশেষায়িত ও স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনে কাজ চলছে। এই ইউনিটের কাঠামো ও কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণসহ সামগ্রিক বিষয়ক নিয়ে সম্প্রতি জননিরাপত্তা বিভাগে বৈঠকও হয়েছে।
এ নিয়ে কথা হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টারের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মো. কামরুল আহসানের সঙ্গে। তিনি বুধবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, সাইবার জগতে আমাদের সার্বক্ষণিক মনিটরিং রয়েছে। সেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপরাধমূলক কিছু দেখলে বিটিআরসির সঙ্গে সমন্বয় করে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। নির্বাচন ঘিরে কাজের পরিধি বাড়লে আমরা উইংও বাড়িয়ে দেব।
বাংলাদেশ সাইবার অ্যান্ড লিগ্যাল সেন্টারের আইন উপদেষ্টা গাজী মাহফুজ উল কবির বলেন, আগামী নির্বাচনে বাড়তি কিছু চ্যালেঞ্জ যুক্ত হবে। আগে যেসব ফেসবুক আইডি প্রোপাগান্ডা ছড়াত, সেগুলোকে রিপোর্ট করেই বন্ধ করা যেত। ২০২০-এর শুরুর দিক থেকে সেই সুযোগ সীমিত হয়েছে। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বশেষ প্রযুক্তির সঙ্গে আপডেট থাকা উচিত।
