গত সরকারের শাসনামলে ব্যাংকিং খাতের মতো এতো বড় লুটপাট পৃথিবীর কোনো দেশে হয়েছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ব্যাংকের ৮০ শতাংশ অর্থ বাইরে চলে গেছে! যা বিশ্বের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে বিরল।
শনিবার (২৬ জুলাই) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত একটি আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান রচিত ‘অর্থনীতি, শাসন ও ক্ষমতা: যাপিত জীবনের আলেখ্য’ বইয়ের প্রকাশনা উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
রাষ্ট্রের কাঠামো ভেঙে পড়েছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলো ধ্বংসের পথে, আর মানবসম্পদ রয়ে গেছে অপরিবর্তিত এমন কঠোর বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, সংস্কারের নামে যত পরিবর্তনই আনা হোক, রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিকনির্দেশনা ছাড়া তা ব্যর্থ হবে।
ড. সালেহউদ্দিন বলেন, ‘সুশাসন অত্যন্ত কঠিন। প্রধানমন্ত্রী থেকে সংসদ সদস্য, কারও ক্ষমতার চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স নেই। এখানে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া যত সংস্কারই করা হোক, কোনো লাভ হবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেও সংস্কার দরকার।’
ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘গত সরকারের সময় ব্যাংক খাতে যে লুটপাট হয়েছে, তা পৃথিবীর আর কোথাও হয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ব্যাংকের ৮০ শতাংশ অর্থ বাইরে চলে গেছে, যা বিশ্ব ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে বিরল। আইএমএফ বলেছে, ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে ৩৫ বিলিয়ন ডলার লাগবে, যদিও শুরুতে তারা বলেছিল ১৮ বিলিয়ন।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত আগস্টে যখন এই সরকার দায়িত্ব নেয়, তখন যে অবস্থা দেখা গেছে, তা বিশ্বের কোথাও ছিল না। অর্থনীতিতে মারাত্মক বিপর্যয় হয়েছে। আমাদের উন্নয়ন কৌশলেই ভুল ছিল, আজও তা ঠিক হয়নি। এখন আর কয়েক মাসে সব ঠিক করা সম্ভব নয়, তবে আমরা চাই দ্রুত একটি রাজনৈতিক সরকার আসুক, যারা সঠিকভাবে গাইড করবে।’
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বইয়ের লেখক ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, ‘দেবতুল্য ক্ষমতার একমাত্রিককরণই স্বৈরাচার জন্ম দেয়। ক্ষমতার কলুষিত মডেল বিতাড়িত করতে হবে।’
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘সরকারে জবাবদিহিতা না থাকায় দুর্নীতি বহুগুণে বেড়েছে। রাতারাতি সংস্কার সম্ভব নয়, তবে এজন্য গণতান্ত্রিক চর্চা বাদ দিয়ে বসে থাকা যাবে না। কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। বিলম্ব না করে দ্রুত গণতান্ত্রিক পথে ফিরে যেতে হবে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি সংসদে পাঠিয়েই সংস্কার আনতে হবে।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এবং গবেষক-লেখক আলতাফ পারভেজ।
ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র জনগণের হাতে যাওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। বরং এটি একটি তাঁবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে এবং শেখ হাসিনা সেটিকে আরও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।’
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘দুর্বল শাসন ব্যবস্থা ও কুক্ষিগত ক্ষমতার কারণে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়েছে।’
গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, ‘সংস্কার আশানুরূপ হচ্ছে না, কারণ সমস্যার গোড়ার দিকেই যাচ্ছি না। গত ৫০ বছর ধরেই আমরা স্বৈরতন্ত্রে বাস করছি।’
