আর্থিক সংকটে পড়া শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক মিলে একটি বড় ইসলামি ধারার ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইতিমধ্যে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই পাঁচ ব্যাংকের সম্পদের মান নিরীক্ষা শেষ হয়েছে। এসব ব্যাংককে নিরীক্ষা প্রতিবেদন নিয়ে কোনো আপত্তি থাকলে তা জানানোর সুযোগ দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে কেউ নিজেকে সবল প্রমাণ করতে পারলে সেই ব্যাংক তালিকা থেকে বাদ পড়বে। তবে পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে কোনোটিরই তেমন কোনো উন্নতি নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
তিনি চ্যানেল 24 অনলাইনকে বলেন, কোনো কোনো ব্যাংকের একত্রিতকরণের বিষয়ে আপত্তি রয়েছে। তারা একত্রিকরণের অংশ হতে চায় না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যাংকের বক্তব্য হলো- তারা (ব্যাংক) যদি তাদের ইন্ডিকেটর দ্বারা প্রুভ করতে সক্ষম হয় যে, তাদের ফিনান্সিয়াল ইন্ডিকেটরগুলোর উন্নতি হয়েছে। তাহলে একত্রিতকরণের আওতায় আসার প্রয়োজন নেই, বাংলাদেশ ব্যাংক এটা মেনে নেবে। তবে যতটুকু আমি জানি, তেমন কোনো উন্নতি নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, পাঁচটি ব্যাংক যখন একত্রিত হবে তখন বোর্ড হবে একটি। এটি পরবর্তী ধাপের বিষয়। এখন প্রোপারলি তাদের সম্পদের মান নিরীক্ষা করা হচ্ছে। একত্রিতকরণে সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণ হলো- তাদের সম্পর্কে মার্কেটে একটা ধারণা ছিল, ব্যাংকগুলোর অবস্থা ভালো নয়। তারা যখন গ্রাহকের চেকের বিপরীতে টাকা দিতে পারছিল না, তখন এ ধারণা তৈরি হয়। মারাত্মক তারল্য সংকটে আছ ওই ব্যাংকগুলো। একটি ব্যাংকের যখন শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়, প্রভিশন ঘাটতি থাকে তারপরও ব্যাংকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে পারে। যদি তার তারল্য সংকট দেখা দেয়, আমানতকারীদের চেকের বিপরীতে টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হয় তবে সে ব্যাংকের টিকে থাকা দুরূহ হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক শুরুতে এসব ব্যাংককে কিছুটা তারল্য সাপোর্ট দিয়েছে। কিন্তু এটাতো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজ নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক কেন তাদের নগদ টাকা সাপোর্ট দেবে। কিন্তু তখন ক্ষুদ্র আমানতকারীদের কথা চিন্তা করে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এটি সংকট থেকে উত্তরণের পথ নয়। অবস্থা উত্তরণের জন্য যাদের অবস্থা খারাপ এরকম চার-পাঁচটা ব্যাংক একত্রিতকরণ করা হবে। এর ফলে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক মিলে একটি তুলনামূলক সবল ব্যাংক হতে পারবে। তবে এটি করার আগে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আবার ফরেসনিক অডিট করা হবে। ইতিমধ্যে ফরেনসিক অডিট করা হয়েছে। তাদের অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ করা হয়েছে, যা মোটেই সন্তোসজনক নয়। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক সিদ্ধান্ত নেয় একত্রিতকরণের।
আরিফ হোসেন খান বলেন, পাঁচটি ব্যাংক একত্রিতকরণের জন্য পলিসি দরকার। একটি আইনি কাঠামো দরকার, যে কাঠামো ইতিমধ্যে তৈরি করা হয়েছে। ব্যাংক রেজুলেশন অর্ডিন্যন্স জারি করা হয়েছে। ভেতরে ভেতরে একত্রিতকরণের কাজ চলছে। তবে কোনো কোনো ব্যাংক একত্রিকরণের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে।
গেল ১১ মাসে দুর্বল ব্যাংকগুলো কেন ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি— এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, ব্যাংকগুলো জনগণের আস্থার জায়গা উন্নতি করতে পারেনি। প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক সবাই একটা শঙ্কার মধ্যে টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করছে, তবে ব্যর্থ হচ্ছে। ব্যাংকগুলো যদি আস্থার জায়গায় উন্নতি করতে পারতো, তাহলে ঘুরে দাঁড়াতে পারতো। গ্রাহকদের টাকা উত্তোলন করার প্রবণতা বেশি। টাকা উত্তোলনের প্রবণতা যদি খুবই কমে যায়, তবে ব্যাংকগুলো তারল্য সংকট থেকে বের হয়ে আসবে। দুর্বল ব্যাংকগুলো টাকা ফেরত দেয়ার অক্ষমতার কারণে আরও বেশি খারাপের দিকে চলে যাচ্ছে।
পাঁচ ব্যাংক মিলে হবে একটি ব্যাংক
আর্থিক সংকটে পড়া শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক মিলে একটি বড় ইসলামি ধারার ব্যাংক গঠন করার ঘোষণা দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর আহসান এইচ মনসুর। গত ১৫ জুন এ ঘোষণা দেন তিনি। নতুন এই ব্যাংকের যাত্রার শুরুতে মূলধন জোগান দেবে সরকার। ব্যাংকটির প্রধান কাজ হবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে (এসএমই) অর্থায়ন করা। এই ব্যাংকের অনুমোদন (লাইসেন্স) দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অধীনে এই পাঁচ ব্যাংকের আমানত ও সম্পদ স্থানান্তর করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ব্যাংক একীভূত হলেও গ্রাহকদের লেনদেনে কোনো সমস্যা হবে না। তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন ব্যাংকটির গ্রাহক হবেন। এ ছাড়া শীর্ষ পর্যায় ব্যতীত অন্য ব্যাংকাররা একীভূতকরণের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত চাকরিতে বহাল থাকবেন। এ প্রক্রিয়া শেষ হতে অন্তত তিন বছর লাগতে পারে।
ব্যাংক পাঁচটি হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক।
