জনশুমারি ও গৃহগণনার ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি দেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ১৫ লাখ ৯০ হাজার। গত বছর ২৪ মার্চ রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তত্ত্বাবধানে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। এই সংখ্যাটি এখন সবারই জানা। তবে যে সহজ তথ্যটি জানা নেই তা হচ্ছে, একাত্তর সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভের পর এই স্বাধীন বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কত মানুষ মারা গেছে সেই পরিসংখ্যানটি।
মানুষ জীবিত থাকাকালীন তার অস্তিত্ব বেশ স্পষ্ট থাকে। তার জন্ম তারিখ, বয়স, পেশা, বৈবাহিক অবস্থা এসব জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে দৃশ্যমান থাকে। রাষ্ট্র সাধারণত নাগরিকের এই তথ্যগুলো সংরক্ষণ করে। কিন্তু মৃত্যুর পর মানুষ যেভাবে রাষ্ট্রের আদমশুমারি ব্যবস্থার আড়ালে চলে যায় তা নিয়ে আলোচনা নেই। সেই ব্যক্তিটি যিনি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে সম্মুখসারিতে ছিলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গণে বীরের মতো লড়েছেন তিনিই যখন আশি-নব্বইয়ের দশক কিংবা একবিংশ শতাব্দির প্রথমাংশে বার্ধক্যজনিত কারণে এ স্বাধীন দেশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন তখন তাকে স্বতন্ত্রভাবে মূল্যায়ন করা হলেও তিনি রাষ্ট্রীয় শুমারি থেকে হারিয়ে যান।
একইভাবে হারিয়ে যান বিচারক,কবি,সাহিত্যিক,সাংবাদিক,শিক্ষক, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্বপালনকারী উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ কর্তারাও। আরও দ্রুত হারিয়ে যান সাধারণ মানুষ, হতদরিদ্র জনগণ, দিনমুজুরসহ পদ-পদবীহীন লাখো বাংলাদেশি।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও প্রায় একই চিত্র দেখা যায়। প্রতিটি দেশের জীবিত জননতে পারি। তবে তার সঙ্গে মৃত ব্যক্তির সংখ্যা আর গণনায় রাখা হয় না। তারা সবাই রাষ্ট্রের জনশুমারির বাইরে চলে যান। তাদের কয়েকজনের প্রতিদান ইতিহাসের খাতায় অম্লান হয়ে থাকলেও প্রায়শই অধিকাংশই অদৃশ্য থেকে যান মৃতের খাতায় নিবন্ধিত না হওয়ায়।
মৃত ব্যক্তির হিসাব নিয়ে আলোচনা করলে একই রকমের হতাশাজনক চিত্র দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানির মতো উন্নত দেশগুলোতেও। স্বাধীনতার সূচনালগ্ন থেকে মৃত্যুর হিসাব রাখতে ব্যর্থ হয়েছে বর্তমানে বিশ্বের শক্তিধর এই দেশটিও। ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে এখন পর্যন্ত মৃত মার্কিন নাগরিকদের সুনির্দিষ্ট তালিকা নেই ফেডারের সরকারের কোন দপ্তরের কাছে। তবে ১৯৩৩ সাল থেকে সব অঙ্গরাজ্যে নাগরিক মৃত্যুর রেকর্ড আছে, কিন্তু এর আগের তথ্য আংশিক।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানিতেও একই চিত্র। প্রাথমিক যুগে রেকর্ড আংশিক ছিল, প্রধানত গির্জা বা স্থানীয় নথিভিত্তিক। এসব দেশ বার্ষিক বা মাসিক সমষ্টিগত তথ্য প্রকাশ করে, তবে শতাব্দীজুড়ে কত নাগরিক মারা গেলেন সেই তথ্য রাখে না। ফলে দেশের স্বাধীনতা, অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে দেয়া মহান ব্যক্তিরাই কালের স্রোতে ‘নামহীন মৃতদের ভিড়ে’ বিলীন হয়ে যান।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রসঙ্গে এটি আরও স্পষ্ট। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পরাধীনতার শৃঙ্খল গুঁড়িয়ে দেয়ার জন্য অসংখ্য মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছেন, শহিদ হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় নথিতে আমরা শহিদ মুক্তিযোদ্ধার নাম পাই, তবে সাধারণ গ্রামীণ মানুষদের নাম আজও অজ্ঞাত। তাদের স্ত্রী, সন্তান এবং পরিবার যারা আজও সেই ত্যাগের ভার বহন করছে, তাদের অবদান রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত হয়নি। এই শূন্যতা ইতিহাসে বৈষম্যমূলক দৃষ্টিকোণ সৃষ্টি করে যা অনেকের কাছে বেদনাদায়ক।
বাংলাদেশে ৫৪ বছরে কত মানুষ মারা গেছেন: ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসের পর থেকে এখন পর্যন্ত এই স্বাধীন ভূখণ্ডে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষ মারা গেছেন। মোট জনসংখ্যা ও বার্ষিক মৃত্যুহারের গড় ব্যবহার করে এমনটি প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে বার্ষিক মৃত্যুর হার হাজারে ৬ জন। সত্তরের দশকে এই হার ছিল দ্বিগুণের বেশি, হাজারে ১৩ জন। স্বাধীনতার প্রথম দশকে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা সাত কোটির বেশি থাকলেও সেই সময়কালে মৃতের সংখ্যা ছিল প্রায় ৯১ লাখ।
আশির দশকে জনসংখ্যা দুই কোটি বাড়ে তবে তখন প্রায় সমান সংখ্যক ৯০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
নব্বয়ের দশকে জনসংখ্যা বেড়ে ১১ কোটি হয় তবে মৃত্যুর হার কমে হাজারে ৮ জন হয়। সেই দশকে মৃতের সংখ্যা আনুমানিক ৮৮ লাখ।
একবিংশ শতাব্দির প্রথম দশকে (২০০০-২০১০ সাল) জনসংখ্যার সঙ্গে আরও ২ কোটি যোগ হয়। তবে মৃতের হার হাজারে ছিল ৭ জন। সেই দশকে মৃতের সংখ্যা আনুমানিক ৯১ লাখ। পরবর্তী দশকে (২০১০-২০২০ সাল) জনসংখ্যা বেড়ে হয় ১৫ কোটি আর মৃতের হার কমে হয় প্রতি এক হাজারে ৬ জন। সেই দশকে মৃতের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ৯০ লাখ।
চলমান দশকের (২০২০-২০৩০ সাল) প্রথমার্ধে মৃতের হার কমে বছরে হয়েছে হাজারপ্রতি ৬ জন। এসময় জনসংখ্যা হয়েছে ১৭ কোটি ১৫ লাখের বেশি। এই দশকে মৃতের সংখ্যা হতে পারে এক কোটি কিছু বেশি আর প্রথম পাঁচ বছরে তা হতে পারে ৫০ লাখের কিছু বেশি। প্রাথমিকভাবে এই হিসেবে এই সাড়ে পাঁচ দশকে বাংলাদেশে মারা গেছেন ৫ কোটি ৫০ লাখের বেশি মানুষ।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বা জনসংখ্যাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘এই ৫৪ বছরে বাংলাদেশে মোট কত মানুষ মারা গেছেন এর সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে এই সময়কালে মোট জনসংখ্যা এবং মৃত্যুর হারের পরিবর্তন নিয়ে হিসাব কষে এটি বের করা যেতে পারে।’
ঢাবির এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘২০০৪ সালে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন আইন সংসদে পাস হলেও এর কার্যকারিতা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। প্রায় ১৭টি ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুবিধা পাওয়ার স্বার্থে জন্মনিবন্ধন সনদ থাকা বাধ্যতামূলক হওয়ায় এটি কিছু মাত্রায় কার্যকর হয়েছে। তবে মৃত্যু-সনদের সঙ্গে তেমন স্বার্থ-সংশ্লিষ্টতা না থাকায় এটি করার প্রতি মানুষের আগ্রহ খুবই কম। দেখা গেছে, মৃত ব্যক্তির মালিকানাধীন সম্পদের বণ্টন ও তার পেনশনের সুবিধা পেতে উত্তরাধিকারীরা মৃত্যুসনদ তৈরি করতে আগ্রহী হন।’
স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক অর্জন নয়, বরং এর মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের অবদান এবং আত্মদানের প্রতি সম্মানও নিশ্চিত করতে হবে। তাই অনেকের প্রত্যাশা, চিরবিদায় নেয়া মানুষেরাও দেশের জীবিত নাগরিকদের মতো রাষ্ট্রীয় গণনায় যুক্ত হয়ে থাকুক। কেননা তাদের ভুলে গেলে চলবে না, এই সাড়ে পাঁচ কোটির অধিকাংশই আজকের এই উদীয়মান বাংলাদেশের মূল ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন।
