ঢাকা মঙ্গলবার , ২৬ আগস্ট ২০২৫
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার পথে পাকিস্তানের নতুন প্রস্তুতি, কেন জরুরি হলো ‘রকেট বাহিনীর’

আইএম নিউজ ডেস্ক
আগস্ট ২৬, ২০২৫ ৮:৪১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

পাকিস্তানের ৭৮তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ একটি নতুন আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড (এআরএফসি) গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তি এবং শত্রুকে সকল দিক থেকে আঘাত করার ক্ষমতা থাকবে এই বাহিনীর।’

আল জাজিরার একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। গত ১৩ আগস্ট ইসলামাবাদে এক অনুষ্ঠানে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটি আমাদের প্রচলিত যুদ্ধক্ষমতা আরও বাড়িয়ে তুলবে।’

পাকিস্তানের অন্যতম “শত্রু” ভারত। দেশটি পাকিস্তানের পারমাণবিক-সশস্ত্র প্রতিবেশী এবং প্রতিদ্বন্দ্বীও। ইতোমধ্যে ঘোষণা হয়েছে আগামী এক সপ্তাহ পরে ৫ হাজার কিলোমিটার (৩ হাজার ১০০ মাইল) সর্বোচ্চ পাল্লার অগ্নি-ভি মধ্যবর্তী-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করবে নয়াদিল্লি।

এদিকে মে মাসে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে চার দিনের উত্তেজনাপূর্ণ সংঘর্ষের পর নতুন প্রস্তুতি শুরু করেছে ইসলামাবাদ। ঘোষণা দিলো নতুন রকেট বাহিনী (এআরএফসি) তৈরির।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই দেশের সর্বশেষ এই সংঘর্ষ পাকিস্তানের কৌশলগত প্রতিরোধ ক্ষমতার ত্রুটি উন্মোচন করেছে। দেশটি প্রায় তিন দশক ধরে হুমকি, ভয় দেখানো কিংবা সংঘাতের ক্ষেত্রে কেবল পারমাণবিক অস্ত্রের বয়ানের উপর নির্ভর করে এসেছে।

ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ এবং ইরান ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘর্ষসহ যুদ্ধেও নির্ভুল-নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা ছিল বেশ লক্ষ্যণীয়। এমন পরিস্থিতিতে রকেট বাহিনী প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন অনুভব করে পাকিস্তান।

পাকিস্তানের আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড কী?

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এটিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি নতুন বাহিনী হিসেবে বর্ণনা করেছেন যা প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্রীভূত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

পাকিস্তানের সামরিক কমান্ড কাঠামোর অধীনে, এর পারমাণবিক অস্ত্রাগার স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানস ডিভিশনের (এসপিডি) অধীনে পড়ে, যেখানে কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি (এসসিএ) দ্বারা নেওয়া হয়। এটি দেশটির পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র নীতির সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা।

পাকিস্তানের শাহিন-৩ দূর পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।

পাকিস্তানের শাহিন-৩ দূর পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।

এসপিডিতে কর্মরত প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তা নাঈম সালিকের মতে, এআরএফসি পারমাণবিক-সক্ষম অস্ত্রের পরিবর্তে গাইডেড প্রচলিত রকেট সিস্টেমের ওপর মনোনিবেশ করবে।

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, প্রথাগত ৩০-৩৫ কিলোমিটার রেঞ্জের আর্টিলারির বিপরীতে এআরএফসি গাইডেড রকেটের ওপর মনোনিবেশ করে বাহিনীকে ডেভেলপ করা হচ্ছে। এটি সম্পূর্ণরূপে প্রচলিত সিস্টেম এবং পারমাণবিক ক্ষমতার ওপর নির্ভরতা রাখে না।

তিনি বলেন, পারমাণবিক-সক্ষম ব্যালিস্টিক এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এসপিডি এবং এসসিএ’র নিয়ন্ত্রণে থাকে, অন্যদিকে এআরএফসি সেনাবাহিনীর জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স দ্বারা তত্ত্বাবধান করা হবে।

এছাড়া প্রাক্তন সেনা ব্রিগেডিয়ার এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও পারমাণবিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ তুঘরাল ইয়ামিন বলেন, এআরএফসি তৈরির প্রয়োজনীয়তা হলো- প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, সীমিত সংঘাতের সময় অপারেশনাল প্রস্তুতি বৃদ্ধি এবং ক্ষেপণাস্ত্র সম্পদ মোতায়েনের দক্ষতা বৃদ্ধি নিশ্চিত করা।

ইয়ামিন আরও বলেন ‘রকেট ফোর্স কমান্ডকে ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক হুমকির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা উচিত। এটি কোনো একটি পরীক্ষা বা সংঘর্ষের প্রতি প্রতিক্রিয়া নয়।’ পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বর্তমানে দেশজুড়ে নয়টি কর্পস পরিচালনা করে। এর মধ্যে তিনটি বিশেষায়িত কমান্ডের পাশাপাশি বিমান প্রতিরক্ষা, সাইবার এবং স্ট্র্যাটেজিক ফোর্সেস কমান্ড, যা পারমাণবিক সরবরাহ ব্যবস্থা পরিচালনা করে।

এআরএফসি একজন তিন তারকা জেনারেলের নেতৃত্বে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা এর কৌশলগত তাৎপর্য প্রতিফলিত করে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একজন তিন তারকা জেনারেল হলেন সিনিয়র জেনারেলদের মধ্যে, যাদের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কর্পস এবং অন্যান্য বিভাগগুলোর নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়।

কেন এআরএফসি প্রয়োজন ছিল?

বিশ্লেষকরা যুক্তি দেন, এআরএফসি ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বা মে সংঘাতের জন্য স্বল্পমেয়াদী প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। ইয়ামিন বলেন ‘ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা পাকিস্তানের গতি বজায় রাখতে উদ্বুগ্ধ করে। রকেট ফোর্স কমান্ড স্বল্পমেয়াদী প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদী মতবাদিক বিবর্তনের অংশ।’ আলবানি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রিস্টোফার ক্ল্যারিও সেই দৃষ্টিভঙ্গির দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রভাষক মনসুর আহমেদ বলেন, পাকিস্তান বছরের পর বছর ধরে প্রচলিত পাল্টা শক্তির সক্ষমতা তৈরির চেষ্টা করে আসছে। সমস্ত পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রও প্রচলিত কৌশলগত বিকল্প তৈরি করেছে। তাই ভারতের ক্রমবর্ধমান পাল্টা শক্তির বিকল্পের মুখে পাকিস্তানের এআরএফসি একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ, যা সক্ষমতার শূন্যতা পূরণ করে।

তিনি যুক্তি দিয়েছেন, ভারতের প্রথম আঘাতের ভঙ্গি এবং দূরপাল্লার নির্ভুল দক্ষতার বিকাশ পাকিস্তানের নতুন সিদ্ধান্তকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

কোন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এআরএফসির আওতায় পড়বে?

পাকিস্তানের কাছে ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য, বায়ু থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য এবং ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিকভাবে স্বল্প থেকে মাঝারি পাল্লার প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করবে নতুন বাহিনীটি।

সালিক বলেন, বর্তমানে এই বাহিনীতে ফাতাহ-১ (১৪০ কিলোমিটার বা ৯০ মাইল পর্যন্ত পাল্লা) এবং ফাতাহ-২ রকেট (২৫০-৪০০ কিলোমিটার বা ১৫৫-২৫০ মাইলের মধ্যে পাল্লা) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যে দুটিই মে মাসের সংঘাতের সময় মোতায়েন করা হয়েছিল। পাশাপাশি হাতফ-১ এবং আবদালির মতো সিস্টেমও রয়েছে, যার রেঞ্জ ৫০০ কিলোমিটার (৩১০ মাইল) কম।

এআরএফসির অধীনে মাল্টিপল-লঞ্চ রকেট সিস্টেম এবং প্রচলিত নির্ভুল-আক্রমণ ক্ষমতার বিকাশ পাকিস্তানের কুইড প্রো কো প্লাস মতবাদ বাস্তবায়নের কেন্দ্রবিন্দু, যা ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধমূলক অবস্থানের প্রতিক্রিয়া বলেও জানান বিশেষজ্ঞরা।

“কুইড প্রো কো প্লাস”-এর পাকিস্তানি মতবাদ বলতে বোঝায়, ভারতীয় আক্রমণের প্রতি পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা, যা একটি সাধারণ পারস্পরিক পদক্ষেপের বাইরেও যেতে পারে। আরও বিস্তৃত ও অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তীব্র হতে পারে এবং এটি সংঘাতকে তীব্রতর করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। মূলত পারমাণবিক উত্তেজনা এড়াতে এই পদ্ধতিগুলো বেশ কার্যকর।

মে মাসের সংঘাত থেকে শিক্ষা

মে মাসের যুদ্ধের সময়, পাকিস্তান যুদ্ধের প্রথম দিনে বেশ কয়েকটি ভারতীয় জেট বিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছিল। প্রাথমিকভাবে কোনও বিমানের ক্ষতি অস্বীকার করলেও, ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তারা অবশেষে বিমান হারিয়েছে বলে স্বীকার করেন। তবে ধ্বংস হওয়া বিমানের সঠিক সংখ্যা স্বীকার করেনি নয়াদিল্লি।

ভারতের দূর পাল্লার অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্র।

ভারতের দূর পাল্লার অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্র।

পাকিস্তানজুড়ে গভীর হামলা চালিয়ে প্রতিশোধও নেয় ভারত, সিন্ধু প্রদেশের ভোলারি বিমান ঘাঁটিসহ বেশ কয়েকটি বিমান ঘাঁটি এবং স্থাপনায় হামলা চালায়। এসব হামলায় ব্যবহার করা হয় ভারত ও রাশিয়ার যৌথভাবে তৈরি ব্রহ্মোস সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র।

১০ মে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে চার দিনের সংঘাত শেষ হওয়ার পর, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তার সামরিক পদক্ষেপ শুধুমাত্র থামিয়েছে ভারত। পাকিস্তানের পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইল সহ্য করা হবে না বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।

পাকিস্তানের পারমাণবিক মতবাদের বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশটির প্রতিরক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র এবং বছরের পর বছর ধরে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের ভাণ্ডার তৈরির ওপর দৃষ্টি দিয়ে আসছে ইসলামাবাদ।

এগুলো যে কোনো বৃহৎ আকারের ভারতীয় অনুপ্রবেশ রোধ করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু ২০২৫ সালের সংঘাত ছিল ছয় বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো যখন দুই দেশ সম্ভাব্য পারমাণবিক উত্তেজনার দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছায়। পারমাণবিক ঝুঁকি এড়াতে এবং পাকিস্তানে হামলা যাতে কেউ না করতে পারে সেজন্য প্রতিরক্ষার ফাঁকফোকড়গুলো পূরণ করার জন্য তৈরি করা হচ্ছে নতুন বাহিনী।

উদাহরণ হিসেবে বলতে গেলে, নাম প্রকাশ না করার অনুরোধে এক বিশ্লেষক বলেন, ‘ভারত যখন ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল, তখন পাকিস্তান তার বাবর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে প্রচলিত ভূমিকায় মোতায়েন করতে পারেনি, কারণ এগুলো কেবল পারমাণবিক মিশনের জন্য এসপিডি এবং স্ট্র্যাটেজিক ফোর্সেস কমান্ড দ্বারা পরিচালিত হয়।

বাবর হলো একটি ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র যার পাল্লা ৭০০ কিলোমিটার (৪৩৫ মাইল) এবং ২০১০ সাল থেকে এটি কার্যকর রয়েছে। ২০১৯ এবং ২০২৫ সালের সংঘাত স্পষ্টভাবে দেখায় যে ভারত পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরোধকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজে পেয়েছে। আর সেটি উপলব্ধি করে এখন, ভারতের ভূখণ্ড কভার করার জন্য এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রচলিত অস্ত্রশক্তি উন্নয়নের বিকল্প পথে মনোযোগ পাকিস্তানের।

সংবাদটি শেয়ার করুন....