ঢাকা শনিবার , ২৫ মার্চ ২০২৩
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রাজা রামনাথ রায়ের দিনাজপুরে একদিন

সুমাইয়া আক্তার মাইমুনা
মার্চ ২৫, ২০২৩ ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

নভেম্বর ২০২২ এর কোন এক মৃদু শীতের দিনে হঠাৎ করে বের হয়েছিলাম দিনাজপুরের ঐতিহাসিক স্থানগুলো দর্শনের উদ্দেশ্যে। যদিও দিনাজপুরেই স্থায়ী বসবাস কিন্তু কখনও ঐতিহাসিক স্থানগুলো পরিদর্শন করার সুযোগ হয়ে উঠে নি।  তাই হঠাৎ করেই বন্ধুরা মিলে কান্তজী মন্দির, রাজবাড়ি ও রামসাগর ভ্রমণে বের হলাম।  সকাল ৬ টা বাজেই  বের হয়ে গেলাম।  দিনাজপুর শহর থেকে ৪০ কি.মি  দূরে বসবাস হওয়ায় যাতায়াতের সময় অনুকূলে ছিলো।

এবার আসি দিনাজপুরের ঐতিহাসিক কিছু নিদর্শনের ইতিহাসের পাতায়।  দিনাজপুরের ইতিহাস অতন্ত্য প্রাচীণ ও সমৃদ্ধ।  সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যেমন্ডিত বাংলাদেশের উত্তরের জেলা দিনাজপুর চাল,লিচ উৎপাদনে বিখ্যাত হওয়ার পাশাপাশি প্রাচীণ ও ঐতিহাসিক কিছু নিদর্শনের জন্যও বিখ্যাত।  এর মধ্যে  ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা কান্তজী মন্দির,  প্রাচীণ ইতিহাস ও ঐশ্বর্যের প্রতীক রাজবাটী এবং মানুষের খননকৃত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দিঘি রামসাগর দিঘি।

হালকা  উষ্ণ শীতের  সকালে কান্তজী মন্দির হয়ে রাজবাড়ী থেকে রামসাগর দিঘির উদ্দেশ্যে রওনা। দিনাজপুর শহরে ঢোকার  বিপরীত পথে কান্তজী মন্দির এর অবস্থান হওয়াতে সেখানে আগে গিয়েছিলাম। রানীরবন্দর থেকে বাসে উঠে  দশমাইল এ নেমে আবার ঠাকুরগাঁও – পঞ্চগড় এর বাসে উঠে  তেভাগা চত্বরে নেমেছিলাম। তেভাগা শব্দটির জড়িত ঐতিহাসিক এক আন্দোলনের সাথে।  তেভাগা আন্দোলন ১৯৪৬ সালে  দিনাজপুর -রংপুরে শুরু হওয়া একটি কৃষি আন্দোলন। এই আন্দোলনের প্রবর্তক ছিলেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ।   তেভাগা চত্বর থেকে কাহারোল সেতু পার হয়ে পৌঁছালাম  কান্তনগর এলাকায়।  কান্তনগর টেপা নদীর তীরে অবস্থিত। এটিকে অনেকে কান্তজী নদী ও বলে।  কাহারোল সেতু পার হয়ে বাদিকে কান্তনগর প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর। জাদুঘরটি বন্ধ থাকায় সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। সকাল ৮ টার মধ্যেই কান্তনগর মন্দির এলাকায় পৌঁছালাম ।সেখানে চলছিলো হিন্দু ধর্মের ঐতিহাসিক রাসমেলা।  প্রতিবছর নভেম্বর মাসে ৩ দিন ব্যপী এ মেলা চলে।  নানান ধরনের দোকানপাট দিয়ে ছেয়ে গেছে গোটা এলাকা। খাবার দোকান থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকমারি জিনিসপত্রের সমাহার।  হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেলাম মন্দির প্রাঙ্গণে।  মন্দিরের দিকে চোখ রাখতেই মনে হলো টাইম ট্রাভেল করে ১৭-১৮ শতকে প্রবেশ করলাম। হা করে তাকিয়ে রইলাম চারপাশটা। এই মন্দিরের সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করার মতো শব্দ চয়ন করা মুশকিল হয়ে পরবে। এই মন্দিরের অপার সৌন্দর্য নিজেদের ফোন ক্যামেরায় বন্দি করতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম।  ছবিতে কত দেখেছি কিন্তু আজ নিজের চোখে দেখে মনে হলো ছবির থেকেও কয়েকগুণ সুন্দর এই মন্দির।  চমৎকার সুন্দর এর কারুকার্য।  মন্দিরে দেওয়ালে দেওয়ালে খচিত রয়েছে টেরাকোটার নকশা। এমন সুক্ষ্ম  টেরাকোটার নিদর্শন মনে হয়না আর কোনো পুরনো মন্দিরে দেখা মিলবে।   সেসময়ের এই এলাকার শিল্পীরা বাংলার কাঁদামাটির ব্যবহার করে নিজেদের সৃজনশীলতা প্রকাশ করে রেখে গেছেন।  তাৎকালীন শিল্পীরা যে কত সৃজনশীল ছিলো এ মন্দিরের টেরাকোটার কাজ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

এটি কান্তজিউ মন্দির বা কান্তজী মন্দির বা কান্তনগর মন্দির নামে পরিচিত। এটি অষ্টাদশ শতাব্দীর একটি মন্দির।  দিনাজপুর শহর হতে ২০ কি.মি উত্তরে কাহারোল থানায় অবস্থিত।  এ মন্দিরটি নবরত্ন মন্দির নামেও পরিচিত অনেকের কাছে কারণ তিনতলা বিশিষ্ট মন্দিরের নয়টি চূড়া বা রত্ন ছিলো। লোকমুখে শোনা যায় শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহের অধিষ্ঠানের জন্য  মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিলো।

মন্দিরের উত্তর পাশে ভিত্তি–দেবীর শিলালিপি থেকে জানা যায়, তৎকালীন দিনাজপুরের মহারাজা ও জমিদার প্রাণনাথ রায় এই মন্দিরের কাজ শুরু করেন। কিন্তু ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পোষ্যপুত্র রামনাথ রায়  ১৭৫২ সালে মন্দিরটি নির্মাণ কাজ শেষ করেন।

কান্তজী মন্দিরের দেওয়ালে টেরাকোটার কাজ                     ছবি- সুমাইয়া আক্তার মাইমুনা

কান্তজির মন্দিরের স্থাপত্য রীতি, গঠন বিন্যাস, শিল্প ও কারুকার্য ইত্যাদির সংমিশ্রণে এটি হয়ে উঠেছে অত্যন্ত নয়াভিরাম। জমকালো পিরামিড আকৃতির মন্দিরটি তিনটি ধাপে উঠে গিয়েছে এবং তিন ধাপের কোণগুলোর উপরে মোট নয়টি অলংকৃত শিখর বা রত্ন রয়েছে; যা দেখে মনে হতে পারে একটি উচু ভিত্তির উপর প্রকাণ্ড একটি রথ দাঁড়িয়ে আছে।

মন্দিরটি একটি আয়তাকার প্রাঙ্গণের উপর স্থাপিত। এটির চারিদিকে রয়েছে পূজারীদের বসার স্থান। বর্গাকার একটি প্রধান প্রকোষ্ঠকে কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ ইমারতটি নির্মিত হয়েছে। পাথরের উপর দাঁড়ানো মন্দিরের উচ্চতা ৫০ ফুটের বেশি নয়। মন্দিরের নিচতলায় ৩১টি খিলান, দ্বিতীয়  তলায় ৩১টি খিলান এবং তৃতীয় তলায় মাত্র ৩টি খিলান রয়েছে।মন্দিরের দেওয়ালের প্রতিটি ইঞ্চিতে তিনটি পৌরাণিক কাহিনীর অনুসরণে মনুষ্য মূর্তি, প্রতিকৃতি, প্রাকৃতিক বিষয়াবলী ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মহাভারত রামায়ণ এর নানা বিষয়ের উপস্থিতি এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

এমনকি এখানে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের দৃশ্য ও লংকা যুদ্ধের দৃশ্যর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এমন অনেক দৃশ্য ও বিষয় আছে, যা আপনাকে গ্রামবাংলা জীবন-বৈচিত্রকে অনায়াসে মনে করিয়ে দিতে পারে। তেমনি একটি দৃশ্য কৃষ্ণ তার সাথীদের নিয়ে গাছ থেকে নারকেল পারছে এবং অন্য সাথীদের হাতে দিচ্ছে।কান্তজির মন্দিরে সঙ্গে উড়িষ্যা ও দক্ষিণ ভারতের মন্দিরের মিল থাকলেও এখানে কামদ দৃশ্যাবলির অনুপস্থিত রয়েছে। আদি ঐতিহাসিক পাহাড়পুর, ভাসুবিহার, সীতাকোট বৌদ্ধ মন্দিরগুলো লতাপাতা ও মূর্তি দিয়ে বড় বড় পোড়ামাটির ফলক দিয়ে সজ্জিত, যা অনেকটা সেকেলে ধরনের গঠন কিন্তু কান্তনগর মন্দিরের গঠন সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে শিল্পীদের উচ্চতর দক্ষতার প্রকাশ পেয়েছে।

পুরো মন্দির পরিদর্শন করলাম এবং অনেক প্রশ্ন নিয়ে মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে বের হয়ে আসলাম দিনাজপুর শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হবো বলে।  মাথায় ঘুরতেছিলো এত সুক্ষ্ম ও শৌখিন কাজ কিভাবে করেছিলো,  তখন তো এত প্রযুক্তিও ছিলো না।  কত দক্ষতা ছিলো তখনকার শিল্পীদের। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে দিনাজপুর শহরে পৌঁছালাম। বাস টার্মিনালে নেমে অটো নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম দিনাজপুরে আরও একটি ঐতিহ্যমন্ডিত স্থান রাজবাড়ীর উদ্দেশ্যে।

দিনাজপুর রাজবাড়ী প্রবেশদ্বার                           ছবি- সুমাইয়া আক্তার মাইমুনা

এটি ছিলো তাৎকালীন এ অঞ্চলের রাজা মহারাজাদের তৈরী এক অপুর্ব নিদর্শন।  ১০-১৫ মিনিট পর পৌঁছালাম  রাজবাড়ীর প্রবেশদ্বারে। রাজবাড়ী পরিদর্শনের পূর্বে হালকা নাস্তা করলাম। তারপর প্রবেশ করলাম রাজবাড়ীর ইতিহাস খুঁজতে। এ রাজবাড়ীটি দিনাজপুরের প্রাচীণ ঐতিহ্যকে বহন করে আসছে বহু বছর ধরে। বর্তমানে রাজবাড়ীটি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত।  আস্তে আস্তে ঘুরে এলাকাটি পরিদর্শনে মগ্ন হলাম।  রাজবাড়ীটি দিনাজপুর শহর থেকে ১-২ কি.মি উত্তর – পূর্ব দিকে রাজারামপুর গ্রামে  অবস্থিত।  রাজারামপুর গ্রামের কাছে এই স্থানটি বিশেষভাবে ‘রাজ বাটিকা’ নামে পরিচিত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, দিনাজপুর রাজবাড়ীটি রাজা দিনাজ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে অনেকের অভিমত, পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইলিয়াস শাহীর শাসনামলে সুপরিচিত ‘রাজা গণেশ’ ছিলেন এই বাড়ির স্থপতি। শ্রীমন্ত দত্ত চৌধুরী সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে দিনাজপুরের জমিদার হন। কিন্তু শ্রীমন্ত দত্ত চৌধুরীর ছেলের অকাল মৃত্যুতে তার ভাইপো “সুখদেব ঘোষ” সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন। প্রকৃতপক্ষে বর্তমান দিনাজপুর রাজবাড়ি মানেই এর অবশিষ্টাংশ। এর বেশির ভাগই ধ্বংস হয়ে গেছে। মাত্র কয়েকটি ইনস্টলেশন এখন বিদ্যমান।  প্রাসাদের প্রবেশপথে পশ্চিমমুখী একটি মিনারের আকারে একটি বিশাল খিলান রয়েছে। প্রাসাদের সীমানার মধ্যে বামদিকে একটি উজ্জ্বল রঙের কৃষ্ণ মন্দির এবং ডানদিকে প্রাসাদের বাইরের কিছু ধ্বংসাবশেষ রয়েছে।প্রাসাদের সীমানার ভিতরে আরেকটি খিলান রয়েছে, যেখান দিয়ে প্রাসাদের মূল বর্গাকার অংশে প্রবেশ করা হয়েছে। প্রাসাদের মূল অংশের পূর্বদিকে আরেকটি সমতল ছাদের মন্দির। যেটিতে অনেক হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি রয়েছে। রাজবাড়ী প্রধানত তিনটি মহল বা ব্লক নিয়ে গঠিত। এই মহলগুলো হল: আয়না মহল, রানী মহল ও ঠাকুরবাটি মহল। পাশাপাশি আরও কয়েকটি ছোটখাটো স্থাপনা রয়েছে; যা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজা ও জমিদার পরিবারের উত্তরসূরিরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই প্রাসাদের সীমানার মধ্যে আরও কয়েকটি মন্দির, বিশ্রামাগার, দাতব্য চিকিৎসালয়, জলের ট্যাঙ্ক এবং আমলাদের কোয়ার্টার স্থাপন করা হয়েছিল। দিনাজপুর রাজবাড়ীর মোট জমির পরিমাণ ১৬.৪১ একর; এর মধ্যে রয়েছে দুটি বড় জলের ট্যাঙ্ক, একটি মঠ, একটি বাগান, একটি মাটির ঘর, একটি টেনিস কোর্ট এবং পূর্ব ও পশ্চিম দিকে একটি কুমোরের বাড়ি।

রাজবাড়ী ঘুরে দেখতে দেখতে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে গেলাম।  তাই সেখান থেকে খাওয়ার জন্য বের হলাম।  দিনাজপুরের রুস্তম হোটেলের গরুর মাংস খুব বিখ্যাত বলে শুনেছিলাম । একটা অটো নিয়ে সেখানে গেলাম ,  দোকানে খুব ভীড় দেখে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম।  পেটভরে খেয়ে কোনোরকম বিশ্রাম না নিয়েই আবার রামসাগরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।  কেননা দিন শেষে বাসায় ফিরতে হবে আর থাকার ও কোনো পরিকল্পনা ছিলো না।  দুপুরের খাবার খেয়ে ইজিবাইকে করে রামসাগর দেখার জন্য যাত্রা শুরু করলাম।  আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ  থাকায় তেমন একটা ক্লান্ত হই নি ।  যাত্রাপথে  রাস্তার দুপাশে কৃষিখেত ও মৃদু হাওয়া ভালোই লাগছিলো। প্রায় ৩০ মিনিট  পরে পৌঁছে গেলাম  আমাদের গন্তব্যস্থলে ” রামসাগর জাতীয় উদ্যান”। রামসাগর দিঘিটি শহরের  বাইরে হওয়ায় এখানকার পরিবেশ বেশ মনোরম ও শান্ত ছিলো। তখন বেলা ২ টা বাজে। টিকিট কেটে রামসাগরে প্রবেশ করলাম এই জায়গার বিশেষত্ব হলো ঐতিহাসিক রামসাগর দিঘি ও রামসাগর মন্দির।

রামসাগর মন্দির (ধ্বংসপ্রায়)                                   ছবি-    সুমাইয়া আক্তার মাইমুনা

উদ্যানের ফটক দিয়ে ঢুকে কিছু দূর গেলেই হাতের ডানে, রামসাগর দিঘির উত্তর পাশে পড়বে রামসাগর মন্দির। একটি ঢিবির ওপর ঝোপঝাড়ের মধ্যে পড়ে আছে মন্দিরটি।আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া এটিকে ‘দেব মন্দির’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যদিও মন্দির বলে আর কিছু নেই, মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী দেখে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ধারণা, এটি ১৭ থেকে ১৮ শতাব্দীতে নির্মিত। অন্যদিকে অনেক গবেষক মনে করেন, দিঘি খননের সময়ই (১৭৫০-১৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে) দিনাজপুরের মহারাজা রামনাথ রায় মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। বর্গাকারে নির্মিত মন্দিরের দেয়ালে বহু টেরাকোটা বা চিত্রফলক ছিল। এখন কিছুই অবশিষ্ট নেই। গাছের শিকড় ও লতাপাতার বাহুপাশে বিলীন হওয়ার পথে স্থাপনাটি।

মন্দির রেখে আমরা এগিয়ে গেলাম। কয়েক পা এগোতেই আমাদের সামনে পরলো রামসাগর দিঘি। বিশাল এর দেহ, মোহনীয় এর রূপ। ঘন সবুজ গাছে ঘেরা দিঘিটি উত্তর-দক্ষিণে ১ হাজার ৭৯ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৯২ দশমিক ৬ মিটার। এর গভীরতা প্রায় সাড়ে ৯ মিটার। আমরা দিঘিপাড়ের বেঞ্চে বসলাম। গাছের ছায়া ঘন হয়ে আসছে, পাখিরা নীড়ে ফিরছে, দিঘির পানিতে ভাসছে লতাপাতা, দলবেঁধে ছোটাছুটি করছে জল স্ট্রাইডার পোকা, পাখি ও কীটপতঙ্গের ডাকাডাকি মিলেমিশে একাকার- সব মিলিয়ে এক অপরূপ অডিও-ভিজুয়াল।  উপভোগ করার মতো পরিবেশ।  অনেক কবি সাহিত্যিক এখানে বসে কবিতাও আঁকতে পারবে এমন পরিবেশ নিরিবিলি।

রামসাগর দিঘি                                             ছবি-সুমাইয়া আক্তার মাইমুনা

এই দিঘির কথা অনেক শুনেছি। বুঝলাম এটিকে শুধু শুধু দেশের সবচেয়ে বড় মানবসৃষ্ট দিঘি হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। পলাশী যুদ্ধের কয়েক বছর আগে মহারাজা রামনাথ রায় দিঘিটি খনন করিয়েছিলেন। প্রজাদের খরা ও দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচাতেই এই উদ্যোগ। সে সময় প্রায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে তিনি এই দিঘিটি করেন। দিঘিটি নিয়ে আছে নানা গালগপ্পো। একটি গল্প তো উদ্যানের সাইনবোর্ডেই লেখা আছে। দিঘি খনন করার স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন প্রাণনাথ রায়। পুকুর খনন করালেন। কিন্তু পুকুরে যে পানি নেই! তখন রাজা দৈববাণী পেলেন, একমাত্র পুত্র রামনাথকে দিঘিতে বলি দিলে পানি উঠবে! সে অনুযায়ী রাজা দিঘির মাঝখানে একটি ছোট মন্দির তৈরি করলেন এবং এক ভোরে রামনাথকে নামালেন সেই মন্দিরে। মন্দিরে পা রাখতেই পানি উঠতে শুরু করে। সেই পানিতে তলিয়ে যান রামনাথ। যুবরাজের স্মরণে দিঘির নাম ‘রামসাগর’। ইতিহাসের সঙ্গে এই গল্পটি একেবারেই খাপ খায় না। ইতিহাস বলে, রামনাথের আমলেই দিঘিটি নির্মিত। আরেকটি জনশ্রুতিতে দিঘি খননকারী মহারাজা রামনাথ রায়। খনন করার পরও দিঘিতে পানি নেই। তখন স্বপ্নদেশ পান, দিঘিতে কেউ প্রাণ বিসর্জন দিলেই পানি উঠবে। তখন ‘রাম’ নামের এক যুবক দিঘিতে প্রাণ বিসর্জন দেন। রাজার নির্দেশেই নাকি সেই যুবকের নামে দিঘিটির নামকরণ করা হয়। যাহোক, ২০০১ সালে এলাকাটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হলেও এর ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত নাজুক। উদ্যানের এবং উদ্যানে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে কেউ ভাবেন বলে মনে হয়নি। দিঘিটি অনেক বড় ছিলো তাই পুরোটা প্রদক্ষিণ করতে সক্ষম হতে পারি নি। আাবার সন্ধ্যা ও হয়ে আসতেছিলো বাসায় ফিরতে হবে  বিধায় রামসাগর কে পিছনে রেখে বের হয়ে আসলাম । তারপর সেখান থেকে সোজা দিনাজপুর বাস টার্মিনালের দিকে রওনা হলাম বাসার উদ্দেশ্যে। রাত ৭-৮ বাজে আমরা বাসায় পৌঁছালাম দিনাজপুরের বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থানগুলো দর্শন করে।  দিনটি খুবই রোমাঞ্চকর ছিলো সাথে ক্লান্তিও।

রাজা রামনাথ রায়ের সাথে দিনাজপুরের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক কান্তজী মন্দির ও রামসাগর ভ্রমণ না করলে বিশ্লেষণ করা অসম্ভব।  দিনাজপুরের ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধির সাথে রাজা রামনাথ ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িত। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক দিনাজপুর বাংলাদেশের একটি অতন্ত্য সমৃদ্ধ অঞ্চল।  কান্তজী মন্দির, রাজবাড়ী ও রামসাগর ছাড়াও আরও অনেক ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান রয়েছে এ অঞ্চলে।  এরমধ্যে  নয়াবাদ মসজিদ, সুখসাগড় দিঘি,  স্বপ্নপুরী, সিংড়া ফরেস্ট, নবাবগঞ্জ জাতীয় উদ্যান, মাটির তৈরি দীপশিখা স্কুল  ইত্যাদি । নিঃসন্দেহে দিনাজপুর ভ্রমণপিপাসুদের জন্য একটি আর্ষণীয় অঞ্চল।

দিনাজপুরের ঐতিহাসিক স্থানগুলো ভ্রমনের কিছু  নিদর্শনা-

কীভাবে যাবেন

যারা দিনাজপুর অথবা দিনাজপুরের আশেপাশের জেলা থেকে আসবে তাদের জন্য সহজ মাধ্যম হলো বাস অথবা ট্রেন।  মোটামুটি ৫০০০-৭০০০ টাকা হলে ঐতিহাসিক স্থানগুলো ভ্রমণ করতে পারেন।

দিনাজপুরের বাইরে থেকে যারা আসবেন -ঢাকা থেকে বাস কিংবা ট্রেনে দিনাজপুর যাওয়া যায়। ঢাকার গাবতলী এবং কল্যাণপুর হতে দিনাজপুরগামী বাসগুলো চলাচল করে। বাস সার্ভিসের মধ্যে নাবিল পরিবহন, এস আর ট্রাভেলস, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, এস এ পরিবহন, কেয়া পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য বাস রয়েছে। নন-এসি এবং এসি বাস ভাড়া মানভেদে ৬০০ হতে ১০০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া লাগবে।

তাছাড়া ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন কিংবা এয়ারপোর্ট রেলওয়ে স্টেশনে আন্তঃনগর দ্রুতযান এবং একতা এক্সপ্রেস ট্রেন সন্ধ্যায় এবং সকালে দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। একতা এবং দ্রুতযান এক্সপ্রেস ট্রেন যথাক্রমে মঙ্গল এবং বুধবার বন্ধ থাকে। শ্রেণীভেদে ট্রেনের টিকেট কাটতে জনপতি ৩০০ হতে ১১০০ টাকা লাগবে।দিনাজপুর জেলা শহর হতে অটোরিকশা  নিয়ে সরাসরি ঘুরে আসতে পারেন।

যেখানে থাকবেন

দিনাজপুর শহরে উন্নত মানের হোটেলে থাকতে চাইলে পর্যটন মোটেল (0531-64718) যোগাযোগ করতে পারেন। পর্যটন মোটেলে রাত্রিযাপনের জন্য রুম ভেদে আপনাকে ভাড়া গুণতে হবে ১৫০০ থেকে ২২০০ টাকা। দিনাজপুরে অবস্থিত অন্যান্য আবাসিক হোটেলের মধ্যে রয়েছে হোটেল ডায়মন্ড, হোটেল আল রশিদ, নিউ হোটেল, হোটেল রেহানা, হোটেল নবীন ইত্যাদি আবাসিক হোটেল। অথবা আত্মীয় বাড়ির থাকলে তো সমস্যাই নাই  কেননা দিনাজপুরের মানুষ খুব অতিথিপরায়ণ।

যেখানে খাবেন

দিনাজপুরে রুস্তম, ফাইভ স্টার কিংবা দিলশাদ হোটেলে গরুর ভুনা মাংস, কাঠি কাবাব ও দিলশাদ রেস্তোরাঁর পাটিসাপটা আপনি খেয়ে দেখতে পারেন। এছাড়াও পুলাহাট বিসিক এলাকায় আবুল হোটেলে ভাত, গরু বা মুরগির মাংস, ডাল ও সবজি দিয়ে খাবার সেরে নিতে পারেন আপনি।

 

লেখিকা:

সুমাইয়া আক্তার মাইমুনা

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর।

বিঃদ্রঃ লেখায় কিছু তথ্য Wikipedia,  বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত কিছু নিবন্ধ থেকে নেওয়া হয়েছে।
সংবাদটি শেয়ার করুন....