ঢাকা শুক্রবার , ১৫ নভেম্বর ২০২৪
আজকের সর্বশেষ সবখবর
১৫ নভেম্বর প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় সিডর

১৭ বছরেও ধকল কাটেনি উপকূলবাসীর

মোঃ মোছাদ্দেক হাওলাদার
নভেম্বর ১৫, ২০২৪ ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

উপকূলের জনপদে কান পাতলে শোনা যায় স্বজনহারাদের দীর্ঘশ্বাস

জ ১৫ নভেম্বর। আজ থেকে ঠিক ১৭ বছর আগে এইদিনটি উপকূলবাসীর ইতিহাসে একটি বিভীষিকাময় দিন। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সামুদ্রিক প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় সিডর প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে আঘাত হানে দেশের উপকূলীয় ১১ টি জেলায়। ঝড়টি ভূমিতে আছড়ে পড়ার সময় প্রথম এক মিনিটে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল প্রতিঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার, যা একে সাফির-সিম্পসন স্কেলে ক্যাটাগরি-৫ এর সাইক্লোনে পরিণত হয়। এতে মূহূর্তেই লন্ডভন্ড হয়ে যায় উপকূলীয় এলাকাগুলো। সিডরের সেই কালো রাতের ভয়াল দূর্যোগ এখনও গোটা উপকূলবাসীকে তাড়া করে ফিরছে। আজও উপকূলের জনপদে কান পাতলে শোনা যায় স্বজনহারাদের দীর্ঘশ্বাস। বিভীষিকাময় দিনটি মনে পরলেই আঁতকে উঠেন উপকূলের মানুষ। উপকূলের মানুষের স্মৃতিতে এখনও ভেসে ওঠে শত শত মানুষের চিৎকার আর স্বজনদের বাঁচার আকুতি।
শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ ওই ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারিয়ে ছিল কয়েক হাজার মানুষ। নিখোঁজ হয়েছিল আরও সহস্রাধিক এর বেশি। এছাড়াও বঙ্গোপসাগরে থাকা ৫ শতাধিক মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারের ৩ হাজার জেলে নিখোঁজ হয়ে যায়, স্থানীয় কৃষি খাত প্রচণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিপুল পরিমাণ ধানী জমির ফসল সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়। যা দুর্যোগ পরবর্তীকালে মোট ক্ষতি ২১০ কোটি ডলার হিসাব করা হয়েছিল। ঘরবাড়ি আর সহায় সম্বল হারিয়ে মানুষ হয়ে পড়ে অসহায়। বাঁধ ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সব কিছু। সিডরের ১৬ বছর কেটে গেলেও আজ পর্যন্ত ধকল কাটেনি উপকূলবাসীর। ক্ষত চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন নিহতদের স্বজনরা। ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোয় নির্মাণ হয়নি টেকসই বেড়িবাঁধ। ফলে এখনও আতঙ্কে দিন কাটে উপকূলবাসীর।
প্রলয়ঙ্কারী সিডরে ক্ষয়ক্ষতি ॥ সরকারি হিসাবে বাগেরহাট ও বরগুনাকে সিডরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। বরগুনা জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুসারে, সিডরে এ জেলায় প্রাণ হারান ১ হাজার ৩৪৫ মানুষ। নিখোঁজ হন ১৫৬ জন। ৩০ হাজার ৪৯৯ টি গবাদি পশু ও ৬ লাখ ৫৮ হাজার ২৫৯ টি হাঁস-মুরগী মারা যায়। ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৬১ টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সম্পূর্ন গৃহহীন হয়ে পড়ে ৭৭ হাজার ৭৫৪ টি পরিবার।
বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুসারে, সিড়রে জেলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ৯০৮ জন। তবে বেসরকারী হিসাবে প্রাণহানীর এ সংখ্যা ছিলো পাঁচ হাজারের বেশী। সিডরের আঘাতে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছিল জেলায় ৬৩ হাজার ঘরবাড়ি। আহত হয়েছিল ১১ হাজারের বেশী মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৪৮২ টি পরিবার, ৩৬৭ কিলোমিটার পাকা রাস্তা, ৮৬২ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক, প্রায় ৬৫ কিলোমিটার বাঁধ এবং ৭৫০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ভোলা, সাতক্ষীরা, ঝালকাঠিসহ উপকূলীয় ১৬ জেলায় ধব্বংসের ছাপ রেখে যায় সিডর।

আজও থামেনি জেলে পরিবারগুলোর কান্না ॥ সিডরে বঙ্গোপসাগরে থাকা ৫ শতাধিক মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারের ৩ হাজার জেলে নিখোঁজ হয়ে যায়। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় সিডরের ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও সন্ধান মেলেনি নিখোঁজ জেলেদের। নিখোঁজ এসব জেলেরা বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে তাও জানেনা পরিবারের সদস্যরা। তবে তাদের পরিবারের সদস্যরা আজো তাদের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে। থামেনি স্বজনহারাদের কান্না। সিডরের কথা মনে করে এখনও আঁতকে ওঠেন তারা। স্বজন হারানোদের ব্যথায় এখনো আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলার জেলে পল্লিতে। নিখোঁজ জেলেদের ফিরে আসার প্রতিক্ষায় প্রহর গুনছেন স্বজনরা।
ভোলা সদর উপজেলার ভেলুমিয়া ইউনিয়নের কূলগাজী গ্রামের সহিজল মাঝি সিডরে আঘাত হানার সময় মাছ ধরতে গিয়ে ছিলেন সাগরে। তিন মেয়ে তিন ছেলে, মা-বাবা আর স্ত্রী রেখে সেই যে গেলেন আর ফিরে এলেন না। আসবেন কিনা তাও জানে না তার পরিবার। এখনো তার ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন সহিজলের স্ত্রী। স্বামীর কথা বলতে গেলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি।
সহিজলের স্ত্রী বলেন, ‘সিডরের সময় সে নদীতে গেছে। বোটে মাছ ধরতে। সে বোট পইর‌্যা গেছে। আর সে ফিরর‌্যা আসে নাই। আর আসবে নাকি হেও জানিনা, আল্লাপাক জানে। ছেলে-সন্তান নিয়া খুব অসহায় আছি। সংসার খুব কষ্টে চলে।’
একই গ্রামের কাদির গাছালির মেয়ে জামাই মিলন মাঝিও মাছ ধরতে গিয়ে প্রাণ হারালেন। নিজে সাগরে গিয়ে ডুবে মরে পরিবারকে ফেলে দিয়ে গেলেন বাস্তবতা নামের অথৈ সাগরে। তার স্ত্রী-পূত্র কন্যা সবাই এখন ছন্নছাড়া সংসারহারা।
স্মৃতিতে সিডর ॥ ‘সিডরের কথা মনে হইলে আইজও কইলজাটা কাইপ্পা ওডে, রাইতে ঘুমাইতে পারি না। বড় বড় গাছ পড়ার ছবি এহনও চোহে ভাসে। মোর ঘরডা পালকের মতো উঠাইয়া নিয়ে গ্যালো। চাতুর দিকে চাইয়া দেহি পানি আর পানি। ব্যানে (সকালে) উইড্ডা দেহি মোর ছাগল-গরু আর নাই। সিডরের দিনের ভয়াল স্মৃতি এমনভাবেই প্রকাশ করছিলেন ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলার আওরাবুনিয়া গ্রামের ফিরোজ মিয়া। তার মতো এমন দুঃসহ স্মৃতি আজও বয়ে বেড়ান উপকূল অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ।’
‘বরগুনা সদর উপজেলার নলটোনা গ্রামের তাসলিমা আক্তারের বাবা-মা আর ছেলের প্রাণ কেড়ে নেয়। একইভাবে গ্রামের আবাদুস সাত্তার সেদিনের প্রবল জলোচ্ছ্বাসের মুখে ধরে রাখতে পারেনি নিজের তিন প্রাণপ্রিয় সন্তান আর স্ত্রীকে। তাদেরকে প্রতিদিন তাড়িয়ে বেড়ায় সেই ভয়াল স্মৃতি।
তসলিমা আক্তার আর আবদুস সাত্তার বলেন, সেদিন রাতে খাওয়া-দাওয়া সেরে তারা ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। বাইরের আবহওয়া ছিল খারাপ। সন্ধ্যা থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। সন্ধ্যা থেকেই তারা শুনছিলেন রেডিওতে বিপদ সঙ্কেতের কথা। তবে তারা বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবেননি। গ্রামের অনেকে গেছেন কাছেপিছে আশ্রয়কেন্দ্রে বা স্কুলে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে হঠাৎ শুরু হয় প্রবল ঝড়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই উড়িয়ে নিয়ে যায় আশ্রয়, আর সেই সঙ্গে যেন সাগর ভেঙে পানি ঢুকে পড়ে বাড়িঘরে। বলেন সাত্তার। পরদিন ভোরের আলো ফুটে উঠতেই তসলিমা ও সাত্তার খুঁজে পান পরিবারের সদস্যদের নিথর দেহ। তবে অনেকের কোনো খোঁজই পায়নি উপকূলবাসী, ভেজা চোখে জানান এই দুজন।’
‘বলেশ্বর নদীর তীরে বাড়ি। ছোটবেলা থেকে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে বড় হয়েছি। ঐ দিন সন্ধ্যা থেকেই একটু বৃষ্টি ও সামান্য বাতাস হচ্ছিল। ভাবছিলাম এটাতো মাঝেমধ্যেই হয়। আব্বার সঙ্গে পরামর্শ করে সবাই ঘরেই থাকলাম। আনুমানিক রাত ১১টার দিকে হঠাৎ বাতাসের বেগ বাড়লো। সবাইকে বললাম দ্রুত ঘর থেকে বের হও। আমিও মুহূর্তের মধ্যে ঘর থেকে বের হয়ে পুরাতন বেড়িবাঁধের মধ্যে থাকা নুর মোহাম্মাদের বাড়িতে গিয়ে উঠি। মাত্র ৫ মিনিটের ব্যবধানে কয়েক ফুট উচ্চতার পানির স্রোত আসে। নুর মোহাম্মাদের ঘরের সব দরজা খোলা ছিল। তার ঘরের মধ্যে যখন চার ফুট পানি প্রবেশ করে তখন সাঁতরে বের হয়ে যাই। পানির স্রোতে যেতে খুব কষ্ট হচ্ছিল তারপরও অনেক কষ্টে পাশের বাড়ির আব্দুল মল্লিকের বাড়ির একটি গাছে উঠে জীবন রক্ষা করেছিলাম। সবকিছুই হয়েছিল বড় অল্প সময়ের মধ্যে। ফজরের আজানের পরে আমি গাছ থেকে নেমে বাড়িতে এসে দেখি আমাদের ঘরের কোনো চিহ্ন নেই। ঘরে থাকা বাবা,মা,ছোট দুই ভাই ও এক বোনকে আর খুঁজে পেলাম না। পরবর্তীকালে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুজির পর ধান ক্ষেতের মধ্যে বাবা, মা ও এক ভাইয়ের মরদেহ পাই। আর এখনো পর্যন্ত বাকি ভাই-বোনকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।’ কান্না জড়জড়িত কন্ঠে কথাগুলো বলছিলেন ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডরে বাবা-মাসহ পরিবারের পাঁচ সদস্যকে হারানো শরণখোলা উপজেলার উত্তর সাউথখালী গ্রামের লাল মিয়া হাওলাদারের ছেলে বাদল হাওলাদার। সিডরের ক্ষত কাটিয়ে উঠলেও দুঃসহ স্মৃতি এখনো কাঁদায় বাদলকে। মনে পড়লেই আঁতকে ওঠেন স্বজন হারানোর বেদনায়।
১৯ কবরে ২৯ লাশ ॥ সিডরে বরগুনা সদরের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাম নলটোনা। এখানে তখন কোনো বেড়িবাঁধ ছিল না। জলোচ্ছ্বাসে এ গ্রামে প্রায় ২০ ফুটের মতো পানি আছড়ে পড়ে। পরের দিনই সেখানে প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষের লাশ পাওয়া যায়। তখনো এলাকাটি ছিল পানির নিচে। লাশ দাফনের জন্য স্থান খুঁজে পাচ্ছিলেন না তাদের স্বজনরা। তখন লাশ নিয়ে দাফন করা হয় কিছুটা দূরে বরগুনা-নিশানবাড়িয়া সড়কের পাশে পশ্চিম গর্জনবুনিয়া গ্রামে। দাফনের কাপড় ছাড়াই ২৯ জনকে ১৯টি কবরে মাটিচাপা দেয়া হয় বলে জানান গ্রামের বাসিন্দারা।
প্রাথমিক পর্যায়ে বরগুনা প্রেসক্লাবের সহযোগিতায় স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা সংগ্রাম এই গণকবরটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কবরগুলো সংরক্ষণ ও আধুনিকায়ন করা হয়। গ্রামের মানুষদের সারা বছরই স্বজনদের কথা মনে করে এখানে দাঁড়িয়ে নীরবে অশ্রু ফেলতে দেখা যায়।
বাকেরগঞ্জ ঘূর্ণিঝড় ॥ প্রাণহানি ও ভয়ঙ্করের দিক থেকে পৃথিবীর ঘূর্ণিঝড়ের ইতিহাসে ষষ্ঠস্থান দখল করে আছে বাকেরগঞ্জ ঘূর্ণিঝড়। ১৮৭৬ সালের ৩১ অক্টোবর বাকেরগঞ্জের উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই ঘূর্ণিঝড় ‘দ্য গ্রেট বাকেরগঞ্জ ১৮৭৬’ নামেও পরিচিত। ওই ঝড়ে আনুমানিক দুই লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। পরবর্তী সময়ে আরও বেশি মানুষ মারা যায় দুর্যোগপরবর্তী মহামারী এবং দুর্ভিক্ষে।
এরআগে ১৯৬০ সালে অক্টোবর মাসে ঘণ্টায় ২১০ কিলোমিটার গতির প্রবল ঘূর্ণিঝড় আঘাতহানে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বাকেরগঞ্জ, ফরিদপুর, পটুয়াখালী ও পূর্ব মেঘনা মোহনায়। ওই ঝড়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষ মারা যায়। পরের বছর ১৯৬১ সালের ৯ মে অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় আঘাতহানে বাগেরহাট ও খুলনা অঞ্চলে। সে সময় প্রায় সাড়ে ১১ হাজার মানুষ মারা যান। ১৯৬২ সালের ২৬ অক্টোবর ফেনীতে তীব্র ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯৬৩ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত হয় চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কক্সবাজার এবং সন্দীপ, কুতুবদিয়া, হাতিয়া ও মহেশখালী উপকূলীয় অঞ্চল। ওইসময় প্রাণ হারান ১১ হাজার ৫২০ জন।
১৯৬৫ সালের ১২ মে ঘূর্ণিঝড়ে বারিশাল ও বাকেরগঞ্জে প্রাণ হারান ১৯ হাজার ২৭৯ জন। সে বছর ডিসেম্বরে আরেক ঘূর্ণিঝড়ে কক্সবাজারে মৃত্যু হয় ৮৭৩ জনের। পরের বছর অক্টোবরে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে সন্দীপ, বাকেরগঞ্জ, খুলনা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও কুমিল্লায়। এতে মারা যান ৮৫০ জন।
গ্রেট ভোলা সাইক্লোন ॥ ১৯৭০ সালের ১৩ নভেম্বর বাংলাদেশের উপকুলীয় এলাকার উপর দিয়ে বয়ে যায় প্রলয়ঙ্করী ‘গ্রেট ভোলা সাইক্লোন’। ওই ঝড়ে চট্টগ্রাম, বরগুনা, খেপুপাড়া, পটুয়াখালী, ভোলার চর বোরহানুদ্দিনের উত্তরপাশ ও চর তজুমুদ্দিন এবং নোয়াখালীর মাইজদি ও হরিণঘাটার দক্ষিণপাশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ঝড়ে প্রাণ হারায় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ।
১৯৮৮ সালের নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় লন্ডভন্ড করে দিয়ে যায় যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা। ওই ঝড়ে পাঁচ হাজার ৭০৮ জন প্রাণ হারিয়েছে। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড় কেড়ে নেয় এক লাখ ৩৮ হাজার মানুষের জীবন।
এখনো দাঁড়াতে পারেনি উপকূলবাসী ॥ সরকারি, বেসরকারি সংস্থা ও উপকূলবাসীর দাবি, সেই সময় ক্ষতিগ্রস্ত খুব কম মানুষকেই পুনর্বাসন করতে পেরেছে সরকার। ফলে অধ্যবদি বেশিরভাগ মানুষের দিন কাটছে চরম দুঃখ-দুর্দশার মধ্যদিয়ে।
আজও হয়নি টেকসই বেড়িবাঁধ ॥ সিডরের ১৬ বছর পার হলেও নির্মিত হয়নি উপকূলীয় রক্ষাবাঁধ। ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে অতিবর্ষণ কিংবা আমাবস্যা-পূর্ণিমার জোয়ারে পানি ঢুকে নষ্ট হয়ে যায় ফসল-ফলাদি। তলিয়ে যায় মাছের ঘেরসহ পুকুর। আমনচাষে হয় সমস্যা। লবণ পানি উঠে নষ্ট হয় ফসল। শক্ত বেড়িবাঁধ না হওয়ায় ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের খবরে আতঙ্কে থাকে উপকূলবাসী। ঝালকাঠির সুগন্ধা ও বিষখালী নদী তীরবর্তী এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় এখনো দুর্যোগ ঝুঁকিতে দিন পার করছে জেলার অনেক পরিবার।
সূত্রমতে, টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকায় ২০০৮ ঘূর্ণিঝড় নার্গিস, ২০০৯ আইলা, ২০১৩ মহাসেন, ২০১৫ কোমেন, ২০১৬ রোয়ানু, ২০১৭ মোরা, ২০১৯ ফণী ও বুলবুল, ২০২০ আমফান, ২০২১ ইয়াস, ২০২২ সিত্রাং ও ২০২৩ সালের মোখার প্রভাবে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে উপকূলীয় জেলাগুলোতে। তাই আজও ত্রানের পরিবর্তে টেকসই বেড়িবাঁধ চায় উপকূলবাসী।
নভেম্বর মানেই আতঙ্ক ॥ ১৭৯৭ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর শুধু নভেম্বর মাসেই ১১টি মারাত্মক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। যার ফলে ব্যাপক প্রাণহানি, গৃহপালিত ও বন্য পশুর মৃত্যুর পাশাপাশি সম্পদহানীর ঘটনা ঘটেছে। তাই উপকূলবাসীর মধ্যে নভেম্বর মাস আলাদা একটি আতঙ্কের মাস।
সে রাতে হাজারো মানুষকে বাঁচিয়েছিলেন ‘সিডর ম্যান’ জয়দেব ॥ ফুল ফুটে ঝরে যায় দুনিয়ার রীতি,মানুষ মরে যায় রেখে যায় স্মৃতি। মানুষ বাঁচে তার কর্মের মধ্যে, বয়সের মধ্যে নয়। মানুষ মরণশীল হলেও কর্মগুণে অমরত্ব লাভ করা সম্ভব। সংক্ষিপ্ত মানবজীবনকে অনন্তকাল বাঁচিয়ে রাখতে হলে তথা স্মরণীয় করে রাখতে হলে কল্যাণকর কর্মের কোনো বিকল্প নেই। ঠিক তেমনি আজও লক্ষাধিক উপকূলবাসীর হৃদয়ে বেঁচে আছেন মানবতার কল্যাণে নিযুক্ত থাকা ‘সিডর ম্যান’ খ্যাত জয়দেব দত্ত। আজ থেকে ঠিক ১৬ বছর আগে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর দেশের দক্ষিন ও পশ্চিম উপকূলে আঘাত হানা স্মরণকালের ভয়াবহ প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হানার আগেই পূর্বাভাস প্রচারের মাধ্যেম অন্তত পাঁচ হাজার মানুষের জীবন বাঁচিয়েছিলেন তালতলী সিপিপির স্বেচ্ছাসেবক জয়েদব দত্ত। ফলে সারা বিশ্বে যিনি ‘সিডর ম্যান’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।
ঘূর্ণিঝড়ের পূর্ভাবাসের বেশ কয়েক দিন আগেই বাইসাইকেলে চেপে হ্যান্ডমাইক নিয়ে বরগুনার তালতলি উপজেলার ঝড়ের পূর্ভাবাস দিচ্ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক জয়েদব দত্ত। ঝড়ের পূর্বদিন থেকেই মহাবিপদ সংকেত ১০ নম্বর দেখানো হয়। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যার পূর্বে উপকূলীয় এলাকায় হালকা বাতাসের সাথে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ও আকাশ রাতের আঁধারের মতো ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। ঘণ্টায় ২২০ থেকে ২৫০ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানে সুপারসাইক্লোন সিডর। তাণ্ডবলীলা শুরু করে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়টি। উপকূলের মানুষজন আজও জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে সংগ্রাম করেই বেঁচে আছে। তবে বেঁচে নেই ‘সিডর ম্যান’ জয়দেব দত্ত।
চিরকুটসহ উদ্ধার হয় জয়দেবের মরদেহ ॥ ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে ৬০ বছরে জয়দেব দত্তর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঐ বছর ৫ আগস্ট (শনিবার) তালতলী উপজেলার বড়বগী ইউনিয়ন পরিষদের সিপিপির ওয়্যারলেস অপারেটর কক্ষের ভেতর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার পাশ থেকে উদ্ধার হয় একটি চিরকুট। যাতে তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান বাড়ি ছাড়ার জন্য অব্যাহতভাবে চাপ দেওয়ার কারণে তিনি বিপর্যস্ত ছিলেন বলে লিখছেন। তার লেখাটি ছিলো, ‘প্রত্যেক সংসারে জ্বালা-যন্ত্রণা থাকে, অভাব-অনটন থাকে মেনে নিয়েছি। অভাবে পড়ে মিন্টু চেয়ারম্যানের কাছে পৈতৃক ভিটি বিক্রি করেছি ২৮ লাখ টাকায়। আট লাখ টাকা বায়না নিয়েছি। বলেছি তাড়াতাড়ি দলিল করে নিন। এক বছর ধরে বলে (মিন্টু) টাকা দেব দেব, আমি বলছি মে-১৭ (২০১৭) মাসে ঘর ছেড়ে দেব।
বর্ষা আসলে মালামাল টানতে সমস্যা হবে। এখন বর্ষাকাল গতকাল্য ১-৮-১৭ তাং চেয়ারম্যান সাহেব বলেন, আগামী সোমবার (৬ আগস্ট) দলিল করব—ঘর ছেড়ে দিতে হবে। এত দিন টালবাহনা করলেন কেন? অভাবে পড়েছি বলে ভিটি বিক্রি করেছি। এখন বর্ষার মধ্যে কিভাবে যাব? আপনি ধনাঢ্য ব্যক্তি, দলিলের কাজ আগেই সমাধান করা উচিত ছিল। আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। ’ চার পাতার সুইসাইড নোটের পাশে লিখেছিলেন, ‘আমার পোস্টমোর্টেম করবেন না। ক্ষোভে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলাম। ’
দুই ছেলের উদ্দেশে জয়দেব লিখেছেন, ‘প্রসেনজিত্-দেবজিত্, তোর মাকে দেখিস। খারাপ কাজ করিস না। মৃত্যু সবারই অবধারিত। আর জ্বালা সহ্য করতে পারি না। মিন্টু চেয়ারম্যান যদি দলিল নেয়ার প্রসেন-দেবজিত্ তোরা দিয়ে দিস, আর যদি আট (লাখ টাকা) ফেরত নেয় সঞ্জীব দাস (শ্যালক), অ্যাডভোকেট জগদীশ, সঞ্জয় (ছোট ভাই) তোরা আমার গ্রামের বাড়ি বিক্রি করে ব্যবস্থা নিস। ’ তিনি আরো লিখেছেন, ‘মানুষ মরণশীল। জীবনে অনেক ভালো কাজ করেছি। সমাজও আমাকে ভালো কাজের স্বীকৃতি দিয়েছে। সমাজের কাছে কৃতজ্ঞ। ’
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের সময় তালতলীর নদী ও সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আগাম সতর্কতা সংকেত প্রচার করে হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষা করেছিলেন জয়দেব দত্ত। এ খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হন তিনি। পরে জনপ্রিয় বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র পক্ষ থেকে তাকে পুরস্কৃত করা হয়। এ সময় ইত্যাদির পক্ষ থেকে তাকে ‘সিডরম্যান’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল।

সংবাদটি শেয়ার করুন....