ঢাকা শনিবার , ২৫ মার্চ ২০২৩
আজকের সর্বশেষ সবখবর

হারিয়ে যাচ্ছে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী শ্যামাসুন্দরী খাল

রিশিতা জাহান,বেরোবি
মার্চ ২৫, ২০২৩ ১০:৪৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

জনসচেতনার অভাব আর সংস্কার ব্যবস্থা না থাকায় আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে শ্যামা সুন্দরী খাল। এতে যেমন রোগ জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে তেমনি বিষাক্ত পানির দুর্গন্ধে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ।

রংপুর মহানগরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া প্রায় ১৩০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী শ্যামাসুন্দরী খালটি ১৮৯০ সালে তৎকালীন ডিমলার দানশীল রাজা জানকী বল্লভ সেন তাঁর মা ‘শ্যামাসুন্দরী’র স্মরণে এ খাল খনন করেছিলেন। শ্যামাসুন্দরীর মতো একটি খাল কেবল রংপুরই নয়, বাংলাদেশেই বিরল। ১৬ কিমি দীর্ঘ এবং স্থানভেদে ৪০ থেকে ১২০ ফুট প্রশস্ত এই খাল পৌর এলাকার উত্তর পশ্চিমে কেল্লাবন্দস্থ ঘাঘট নদী থেকে শুরু হয়ে নগরীর সব পাড়া- মহল্লার বুক চিরে ধাপ পাশারি পাড়া, কেরানী পাড়া, মুন্সী পাড়া, ইঞ্জিনিয়ার পাড়া, গোমস্তা পাড়া, সেন পাড়া, মুলাটোল, তেতুলতলা, নূরপুর, বৈরাগিপাড়া হয়ে মাহীগঞ্জের কেডি ক্যানেল স্পর্শ করে মিশেছে খোকসা ঘাঘট নদীতে।

জানা যায়, সে সময় এ অঞ্চল জুড়ে পয় নিষ্কাশনের তেমন ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতার কারণে ম্যালেরিয়াবাহী মশার উপদ্রব ছিল খুব বেশি। সেই মশার কামড়ে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েই সে সময় মৃত্যুবরণ করেছিলেন রাজমাতা শ্যামাসুন্দরী দেবী। পরে মাতৃ শোকে বিহ্বল রাজা জানকী বল্লভ এই মরণব্যাধীর হাত থেকে এ অঞ্চলের মানুষকে রক্ষা করতে জলাবদ্ধতা আর ম্যালেরিয়া দূর করার জন্যই মায়ের স্মরণে এ খাল খননের উদ্যোগ নেন। খালের নামকরণ করা হয় ‘শ্যামাসুন্দরী খাল’।

কিন্তু যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে আজ থেকে ১৩০ বছর আগে খালটি খনন করেছিলেন রাজা জানকী বল্লভ সেন, কালের বিবর্তন আর জনসংখ্যার আধিক্যে জলাবদ্ধতা দূরীকরণের পরিবর্তে খালটি এখন পরিণত হয়েছে মানুষের মল মূত্র আর বাসাবাড়ির আবর্জনার এক ভাগাড়ে। দখলকারীদের কবলে পড়ে সামান্য এক ড্রেনে পরিণত হয়েছে।প্রায় ৪শত ৮২জন দখলদারের কাছে জিন্মি হয়ে পড়েছে খালটি।খালের অনেক অংশই সংলগ্ন মানুষজন তাদের দখলে কোথাও কোথাও অট্টালিকাও গড়ে তুলেছে। নিয়ম-নীতি না মেনে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠছে।বর্তমানে খালটির ময়লায় পূর্ণ হয়ে গেছে। সংস্কার না করার কারণে মশার আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। ৪০ থেকে ১২০ ফুট প্রশস্ত খালটি বর্তমানে ৮ থেকে ১০ ফুটে পরিণত হয়েছে।ভরাট ও দখল হয়ে যাচ্ছে খালটি।খালের জীর্ণদশা, ময়লা, আবর্জনা ও দূষণে কালো হয়ে গেছে পানি। আবর্জনার স্তুপে বর্তমানে ভরাট হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে পানি প্রবাহ। পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে পড়া ও খালটির সঙ্গে আশপাশের বাড়ি-ঘরের পয়ঃনিষ্কাশনের সংযোগ থাকায় দুর্গন্ধের কারণে খালটির পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। শ্যামা সুন্দরী খালে কালচে পানিতে ভাসছে আবর্জনা। দুইপাশে বাসা-বাড়ির বর্জ্যের স্তুপ। এখন দখল হয়ে সরু হয়ে গেছে এর আকার। খালের দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ স্থানীয়রা। আর একটু বৃষ্টিতেই খালে উপচে পড়ে পানি। শহরে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা।

এখন একটু বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যায় রংপুর শহর। নগরীর শতাধিক পাড়া-মহল্লার প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে যায়। নগরীর কোনো কোনো জায়গা কোমর পর্যন্ত ডুবে যায়। সামান্য একটু বৃষ্টিতে রংপুর নগরী এভাবে ডুবিয়ে যায়।নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য এক সময় যে খাল খনন করা হয়েছিল, সেই শ্যামা সুন্দরী খালটি একটু বৃষ্টিতে উপচে পরে তা এখানকার মানুষ কল্পনা করতে পারে না। দখল-দূষণ আর ভরাট হয়ে এ খালের এমনই অবস্থা যে এটি এখন রংপুর নগরবাসীর দুঃখে পরিণত হয়েছে। রংপুর নগরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ঐতিহ্যবাহী এ খালটি এখন মৃতপ্রায়।

 

প্রতিবেদক

রিশিতা জাহান

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রংপুর 

সংবাদটি শেয়ার করুন....