বরগুনার বেতাগীতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: ফাহমিদা লস্করের বিরুদ্ধে স্টাফদের হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে এবং এক ঠিকাদারের কাছ থেকে উৎক্ােচ গ্রহনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
এ ঘটনায় জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দ্রæত সময়ের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছেন বরগুনা জেলা সিভিল সার্জন।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, রেজাউল ইসলাম উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কক্ষে প্রবেশ করছেন। পরে তাঁদের দুজনের মধ্যে কথোপকথন শোনা যায়। এ সময় রেজাউলের উদ্দেশে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘বিল কি উঠিয়েছেন, কবে? উত্তরে রেজাউল বলেন, ‘জি, বিল উঠিয়েছি, বুধবার।’ তখন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘রিয়াজ মোল্লা কই? সে আমার ঠিকাদার, আপনি তো আমার প্রধান ঠিকাদার না।’ জবাবে রেজাউল বলেন, ‘রিয়াজ মোল্লার মা অসুস্থ, আপনি তো জানেন, আমরা শেয়ারে আছি, তা ছাড়া সব কথাবার্তা তো আমিই বলি আপনি আসার পর থেকে। বৃহস্পতিবার আপনাকে ফোন দিয়েছি, কিন্তু আপনি রিসিভ করেননি।’
এরপর স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘ফোন রিসিভ করিনি মানে? আমি সব সময়ই ব্যস্ত থাকি।’ জবাবে রেজাউল বলেন, ‘আমরাও তো ব্যস্ত থাকি, ঠিকাদারি করি। জুন মাসে আমাদেরও তো অন্যান্য চাপ থাকে। তা ছাড়া আপনি তো সেদিন ২১ তারিখ দেখা করতে বললেন, তাই আমি এখন এসেছি। ওইটা নিয়ে আসছি স্যার।’ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘সেটা আপনার আগে জানানো উচিত ছিল। আমার সাথে কথা বলা উচিত ছিল।’ জবাবে রেজাউল বলেন, ‘আপনার সাথে তো এসব বিষয়ে মোবাইলে কথা বলতে পারি না।’ এরপর স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘মোবাইলে কেন বলবেন? আমাকে ইনফর্ম করতেন যে, স্যার আমি বিল পেয়েছি।’
ওই কথার প্রত্যুত্তরে রেজাউল বলেন, ‘আপনাকে ফোন দিয়েছি, ফোন ধরেননি দেখে আজ অফিসে আসলাম।’ এরপর খামে প্যাকেট করা টাকার বান্ডিল বের করেন রেজাউল। বলেন, ‘স্যার শুধু একটু মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে আর কিছুই না। আপনি রাগ কইরেন না।’ এ সময় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা তাঁর ভাগে কত টাকা আসে জানতে চান। জবাবে রেজাউল বলেন, ‘আপনার আসে ৫৩ স্যার।’ এ সময় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা তাঁর মোট কত টাকা আসে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্যার, আমি হিসাব করিনি। তবে হিসাব রক্ষক সাহেব বলেছেন, স্যারকে এটা দেবেন। বিল পেয়েই আপনাকে নক করেছি।’
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এরপর প্রধান ঠিকাদার রিয়াজ মোল্লাকে ফোন করে বলেন, ‘মামুন (রেজাউল) সাহেব তো এসেছেন, আমার কত ছিল যেন?’ কিছুক্ষণ কথোপকথনের পর তিনি ফোন রেখে দেন। কিছুক্ষণ পর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফার্মাসিস্ট কৃষ্ণ কুমার পালকে ডাকেন এবং বলেন, ‘মামুন সাহেবের কাছ থেকে ওইটা গুনে আপনার কাছে রেখে দেন।’ এরপর অন্য আরেকটি বিলের ব্যাপারে তাঁদের কথা বলতে শোনা যায় ভিডিওতে।’
পথ্য ও স্টেশনারি সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মো. রেজাউল ইসলাম ওরফে মামুন খান বলেন, তিন বছর ধরে বেতাগী হাসপাতালে খাবার (পথ্য ও স্টেশনারি) সরবরাহ করে আসছেন। বর্তমান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বিল নিয়ে তাঁকে প্রায়ই হয়রানি করেন। মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দাবি করেন। দাবি অনুয়ায়ী জুন মাসে তাঁকে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়েছেন।
এ বিষয়ে কৃষ্ণ কুমার পাল বলেন, ‘ওইদিন আমি অফিসে কাজ করছিলাম। স্যার (ফাহমিদা লস্কর) আমাকে তার অফিস কক্ষে ডাকেন এবং মামুনের কাছ থেকে টাকাগুলো গুনে রাখতে বলেন এবং আমি গুনে রাখি।’
বরগুনার সিভিল সার্জন ফজলুল হক বলেন, হাসপাতালে খাবার সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার ভিডিওটি তিনি দেখেছেন। বিষয়টি তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এটি তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তাছাড়া মন্ত্রণালয়ের নিদের্শনা উপেক্ষা করে হাসপাতালের সেবিকা সবিতা মন্ডলকে দিয়ে চালাচ্ছেন টিকিট কাউন্টার, হাসপাতালে কর্মরত (ফার্মাসিষ্ট) কৃষ্ণ কুমার পালকে দিয়ে হিসাবরক্ষক সহ অন্যান্যপদ। ভুক্তভোগি একাধিক কর্মচারি অভিযোগ করেন, যা তার এখতিয়ারভুক্ত নয়। মন্ত্রণালয়ের নিদের্শনায় রয়েছে সেবিকাদের নন নাসির্ং কোন কাজে বসানো যাবে না। কিন্ত মাসের পর মাস সেবিকা এবং অন্যান্য কর্মচারি দিয়ে কাজ করানো হলেও ভয়ে তাঁরা মুখ খুলতে পারে না। বরগুনা জেলা সিভিল সার্জন ও উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে এসব নিয়ে একাধিক অভিযোগ করায় এসব নিয়ে জেলা সিভিল সার্জন সরেজমিনে এসে তদন্তও করেন। কিন্ত অধ্যাবধি এর কোন সুফল পায়নি বলে ভুক্তভোগিরা এসব তথ্য জানান।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ভুক্তভোগী রোগী সূত্রে জানা যায়, ৩১ শয্যা হাসপাতালে ২০ চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও চিকিৎসক আছেন চারজন। ভবন, জনবল ও যন্ত্রাংশ সংকটে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে হাসপাতালের চিকিৎসাসে সেবা। গত বছরের নভেম্বরে ফাহমিদা লস্কর যোগদানের দুই মাসের মাথায় ডা: ফরহাদ হোসেন, ডা: আবু বকর, ডা: বুশরা, ডা: সিগমা, স্টোর কিপার বদরুল আমীন,ওয়ার্ডবয় শুভঙ্কর দেবনাথ, হিসাব রক্ষক জাকির হোসেন, অফিসসহকারি কাম পরিসংখ্যানবিদ ইদ্রিস আলী, সেবিকা তুবা, অন্যত্র বদলী হয়ে যায়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন এ উপজেলাবাসী।
হাসপাতালে সেবিকা সীমা সুতার চলতি মাসে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বাদলি হয়। উর্ধতন কর্তৃপক্ষ দ্রæত সময়ের মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে ছেড়ে দেওয়ার চিঠি দিলেও তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছেনা বলে অভিযোগ করেন তার স্বামী শিশির মিত্র।
বামনা উপজেলায় বদলী হয়ে যাওয়া অফিসসহকারি কাম পরিসংখ্যানবিদ মো: ইদ্রিস আলী বলেন,‘ সারাদিন অশান্তির মধ্যে থাকতাম। প্যাদানি খেতে খেতে দিন যেত। তাই ভয়ে তটস্থ থাকতাম। তবুও কিছু বলতে পারতাম না আর কিছু দিন থাকলে হার্ট এটাক্টে মারা পরতাম।’
বরগুনা জেলা সদরে বদলিকৃত স্টোর কিপার বদরুল আমীন বলেন, ‘ভালো ভালই অন্যত্র বদলি গেছি। এভাবে চলতে থাকলে হাসপাতালে বর্তমানে কর্মরতদের মধ্যে কেউ আর এ হাসপাতালে থাকবে না।’
উৎকোচ নেওয়াসহ এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তা অস্বীকার করে বেতাগী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ফাহমিদা লস্কর মুঠোফোনে বলেন, ঠিকাদারের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কোন প্রশ্নই আসেনা। সবটাই একটা কারসাজি ও ষড়যন্ত্র। কাগজে-কলমে মামুন কোন ঠিকাদার নয়। জানি না আমি তার কথার কতটুকু গুরুত্ব বহন করে। তবে যিনি প্রকৃত ঠিকাদার তার বিরুদ্ধে হাসাপতালে রোগীদের মাঝে মানসম্মত খাবার পরিবেশনের অভিযোগ থাকায় তাকে ডেকে সভা করে হুঁশিয়ার করে দিয়েছি। তিনি বলেন, মামুন সাহেব (রেজাউল) টাকা দিয়ে পার্টনার হয়েছেন কি না, আমি তো জানি না। তা ছাড়া আমাকে তো ভিডিওতে টাকা গুনতে দেখা যাচ্ছে না। কৃষ্ণ (ফার্মাসিস্ট) টাকা গুনছেন, সেটা তো আমাদের অফিসের টাকাও হতে পারে।
ফাহমিদা লস্কর আরও বলেন, এখানে আসার পর আমি স্বাস্থ্য সেবা খাতের ব্যাপক পরিবর্তন করেছি। যেখানে আগে সেবার অভাবে রোগী যেত না সেখানে এখন শত শত রোগী হাসাপাতাল মুখি হচ্ছে। আর যেসব চিকিৎসক,কর্মচারি ও বরিশালে সদ্যবদলীকৃত সেবিকা হয়রানির অভিযোগ দিয়েছেন। তাও আদৌ সত্য নয়। ছঁুিটর কারনে বিলম্বিত হয়েছে। তবুও ইতোমধ্যে ওই সেবিকার ছাড়পত্র অফিসে তৈরি করে রাখা হয়েছে। আমি কেমন ভাবে হাসপাতাল চালাই তা সবাই জানে।
