ঢাকা শুক্রবার , ৩ নভেম্বর ২০২৩
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিষখালী নদীতে দেখা নেই ইলিশের , বেতাগীতে হতাশায় জেলেরা

সাইদুল ইসলাম মন্টু বেতাগী,বরগুনা
নভেম্বর ৩, ২০২৩ ৮:২৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

দেশের উপকূলীয় জনপদ বরগুনার বেতাগীতে নিষেধাজ্ঞা শেষে বিষখালী নদীতে ইলিশের দেখা মেলেনি,হতাশায় বাড়ি ফিরছে জেলেরা। তবে জালে ধরা পড়েছে ছোট-বড় সাইজের বেশ কিছু পাঙ্গাস।

বিষখালী নদীর কুল ঘেষে গড়ে ওঠা একটি পৌরসভাসহ ৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত দক্ষিণা এ জনপদের ৩ হাজারেরও বেশি জেলে ইলিশ মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। এসব জেলেদের আশা ছিল মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে জালে প্রচুর ইলিশ ধরা পরবে। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার প্রথমদিনে নদ-নদীতে তেমন ইলিশ ধরা পড়েনি।

শুক্রবার (৩ নভেম্বর) সকাল ও দুপুরে বেতাগী পৌর শহরের মাছ বাজার ও উপজেলার কালিবাড়ী  ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, বাজার ও ঘাট দুইটি একদম সুনসান। কোন হাঁকডাক ও কোলাহল নেই সেখানে। কিছু মাছ বিক্রেতা ৮ থেকে ১০ টি ইলিশ ও ১০০ থেকে-১৬০ টি জাটকা নিয়ে বিক্রির আশায় মাছ নিয়ে বসে আছেন। আড়তদারও বেকার। তবে মাছ বিক্রেতাদের কাছে বড় সাইজের ১৫ থেকে ২০ টি নদীর পাঙ্গাশ মাছের দেখা মিলেছে। উপজেলার কালিকাবাড়ি গ্রামের জেলে মো. রাকীব হাওলাদার বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশ শিকারের জন্য বড় আশা নিয়ে নদীতে নেমে ছিলাম। কিন্ত ইলিশ না মিললেও আমার জালে ১০ কেজী ওজনের একটি পাঙ্গাস মাছ মিলেছে। ইলিশ না পেলেও  পাঙ্গাস পেয়ে খুশি হয়েছি।

শুধূ রাকীবই নয়, একই এলাকার  মো. নাঈম ও হাসান সিকদার ৯ কেজি ওজনের, ফারুক মিয়া ৭ কেজি ওজনের, আরিফ পেয়েছেন ৬ কেজি ওজনের এভাবে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আরও অনেক জেলেরই জালে নদীর পাঙ্গাশ ধরা পড়েছে। বেতাগী  পৌর শহরের মাছ বাজারের মাছ বিক্রেতা জাকির হোসেন জানান, ইলিশ না মিললেও এখানেও বাজারে অনেকটি পাঙ্গাস মাছ উঠেছে। তিনি ১০ কেজি ৫০০ গ্রাম ওজনের একটি নদীর পাঙ্গাস কিনেছেন ইলিশ ধরা জেলের কাছ থেকে। ৭৫০ টাকা দরে প্রতি কেজি পাঙ্গাস বিক্রি করেন।

নদী থেকে নৌকা ও  ট্রলার ঘাটে ফিরছে জেলেরা মলিন মুখ নিয়ে। মাছ বাজারে অলস সময় কাটাচ্ছেন আড়তদার ও মাছ ব্যবসায়ীরা। যেখানে জেলেদের মাঝে উৎসব ও আনন্দ থাকার কথা  কাঙ্খিত ইলিশের দেখা না মেলায় সেখানে শুধূ জেলেই নয়, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাছ ব্যবসায়ী ও আড়তদার সকলের মধ্যেই বিরাজ করছে হতাশা। আড়তদার সূত্র জানায়, এই বাজার এখন প্রায় ইলিশ শূণ্য। অথচ এই সময়ে ব্যাপক পরিমানে ইলিশ আসার কথা। ইলিশের আমদানি কম হওয়ায় দামও আকাশচুম্বী।

বাজারে গিয়ে দেখা মেলে বেতাগী পৌর শহরের বাসিন্দা শিক্ষক মো. মনিরুল ইসলামকে। তিনি এসেছেন ইলিশ মাছ ক্রয়ের জন্য। তিনি জানান, ধারনা করে ছিলেন এ সময়টায় বাজারে প্রচুর ইলিশ পাবেন এবং কম দামে ক্রয় করতে পারবেন। কিন্ত ইলিশ না দেখে হতাশ। ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় দামও বেশি। অবশেষে নদীর পাঙ্গাস কিনে বাসায় ফিরেছেন।

বেতাগী বন্দর মাছ বাজারের আড়তদার মো: ফিরোজ বলেন, ‘এই সময়ে এখানকার মাছ বাজারের ঘাটে অনেক নৌকা ও ট্রলার ভিড়ত ইলিশ নিয়ে। কিন্তু এবার পুরো মাছের বাজার  বিরান। দীর্ঘ দিন ধরে আমি আড়তদারির সাথে জড়িত। কিন্ত জীবনে ইলিশের এতটা আকাল দেখি নাই। মনে হয় যেন, নদীথেকে মাছ উধাও হয়েগেছে। তবে আশার কথা জেলেদের জালে অনেক নদীর পাঙ্গাস মিলেছে।’

এখানকার মাছ বিক্রেতা মো: দুলাল বলেন, ‘প্রায় ১৫ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করি। কিন্তু ইলিশের ভরা এই মৌসুমে এমন আকাল আর দেখিনি। ব্যবসায় টিকে থাকা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।’

ইলিশের এমন আকালের কারণ বিষয়ে জানতে চাইলে বেতাগী উপজেলা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রব সিকদার বলেন, এর পেছনে নির্বিচার জাটকা নিধন অন্যতম কারণ। তবে বাচ্চা ইলিশগুলো যখন নদীর মিঠা পানিতে দল বেঁধে বিচরণ করে, তখন এসব পোনা ছোট ফাঁসের জাল দিয়ে নির্বিচারে ধরে ফেলে এ জনপদের  জেলেরা। আমরা বাজারগুলোতে এসব চাপলি মাছ বলে বিক্রি করতে দেখি। প্রকৃতপক্ষে এগুলোই যে, ইলিশের পোনা। এ সম্পর্কে আমাদের ধারনা ও সচেতনতা কম। অথচ নদীতে এখন ইলিশ না মেলায় এ নিয়ে নানা কথা বলছি।

ইলিশের জেলে আবু খান ও বাদল মৃধা বলেন,‘ নিষেধাজ্ঞা শেষ হতেই  আমরা স্বপ্ন দেখছিলাম এবছর নদীতে জাল ফেললেই ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়বে। তা না পাওয়ায় আমরা হতাশায় ভ’গছি। কীভাবে পরিবার পরিজন নিয়ে সংসারের ব্যায় মেটাবো। জেলে মো: আসাদুল জানান, সরকার মা ইলিশ রক্ষায় যে অভিযান দিয়েছে, তা আমরা মেনেছি। আমরা এতদিনে নদীতে নামি নাই। ধারনা করে ছিলাম এবারে সৃষ্টিকর্তা কিসমতে প্রচুর ইলিশ দিবেন। না পাওয়ায় এখন দেনার মধ্যে পড়তে হয়েছে।

তবে স্থানীয় মৎস্য বিভাগ দাবি, এই সময়ে নদীতে সাময়িক মাছ না মিললেও  নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ায় ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। কেননা  মা ইলিশ নিরাপদে মিঠাপানিতে ডিম ছাড়ার সুযোগ করে দিতেই এই নিষেধাজ্ঞা  দেওয়া হয়।

বেতাগী উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সমাত্বি সাহা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আমাদের মৌসুমের এখন হেরফের হচ্ছে। ইলিশের প্রজনন, উৎপাদনেও তাই হেরফের হচ্ছে। বৃষ্টি, নদীতে ¯্রােত, পানির চাপ এর সঙ্গে ইলিশের প্রজনন-উৎপাদন সম্পর্কিত। তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ইলিশ ধরা পড়বে।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন....