ঢাকা সোমবার , ১৪ জুলাই ২০২৫
আজকের সর্বশেষ সবখবর

শাপলা কি হতে পারে দলীয় প্রতীক, তাহলে ধানের শীষই বা কেন থাকবে- প্রতীকের রাজনীতিতে নয়া বিতর্ক

আইএম নিউজ ডেস্ক
জুলাই ১৪, ২০২৫ ২:২৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায় প্রতীক বরাবরই এক ধরনের আবেগ ও পরিচয়ের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। প্রতীক যেমন নির্বাচনের মাঠে পছন্দের যোগ্য প্রার্থী খুঁজে নিতে ভোটারদের একমাত্র ভরসা, তেমনি এটি দলীয় আদর্শ ও সাংস্কৃতিক অবস্থানকেও প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু এই প্রতীকের রাজনীতিই এখন বিতর্কের কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে- বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) যখন ‘শাপলা’ প্রতীক চেয়ে নির্বাচন কমিশনে আবেদন জানায়। আর তাৎক্ষণিকভাবেই বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, জাতীয় প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত শাপলা কি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতীক হতে পারে? আর যদি না পারে, তবে জাতীয় প্রতীকের অন্যতম অনুষঙ্গ এবং অলংকরণ ধানের শীষ কীভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতীক থাকে?

জাতীয় নাগরিক পার্টি দাবি করেছে, তারা ‘জাতীয় প্রতীক’ নয়, বরং ‘জাতীয় ফুল’ শাপলাকে দলীয় প্রতীক হিসেবে চেয়েছে। তাদের ভাষায়, শাপলা নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রতীক, গ্রামবাংলার প্রতিচ্ছবি, এবং গণঅভ্যুত্থানে অগ্রভাগে থাকা শিক্ষার্থীদের নতুন দলীয় অবস্থানকে সার্থকভাবে তুলে ধরে।

অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন যুক্তি তুলে ধরেছে, শাপলা জাতীয় প্রতীকের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় একে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতীক হিসেবে অনুমোদন দেয়া সম্ভব নয়। সংবিধানের ৪ অনুচ্ছেদে বর্ণিত জাতীয় প্রতীকের মূল উপাদানই হলো পানিতে ভাসমান শাপলা ফুল, যার চারপাশে রয়েছে ধানের শীষ, পাট পাতা এবং তারকা।

তখনই এনসিপি’র পক্ষ থেকে পাল্টা প্রশ্ন উঠে, যদি শাপলা জাতীয় প্রতীকের অংশ হিসেবে নিষিদ্ধ হয়, তাহলে ধানের শীষই বা কিভাবে বিএনপির প্রতীক হলো? এই প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই বলছেন, ধানের শীষ, পাট পাতা বা তারকা জাতীয় প্রতীকের অলঙ্করণ মাত্র; জাতীয় প্রতীকের প্রাণকেন্দ্র শাপলাই। সেই কারণে ধানের শীষ বা পাট গাছকে জাতীয় প্রতীক বলা চলে না-বরং তারা জাতীয় প্রতীককে ঘিরে থাকা সহকারী উপাদান বা অনুষঙ্গ।

প্রতীক কেবল গ্রাফিক চিহ্ন নয়, এটি দলের ইতিহাস ও প্রতিচিন্তার একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন। বিএনপির ‘ধানের শীষ’ জাতীয় পার্টির ‘লাঙ্গল’ এমনকি রাজনীতিতে বর্তমানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীক, এদের প্রত্যেকটির পেছনে রয়েছে কৃষিনির্ভর গ্রামীণ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বাস্তবতা।

এমনকি রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মন্তব্য করেন, ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’র জীবনধারা ফুটে উঠে এই তিন দলের প্রতীকে- মাছ ধরতে ‘নৌকা’ লাগে, ধানের মূল আকর্ষণ ‘ধানের শীষ’, আর চাষাবাদের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হচ্ছে ‘লাঙ্গল’। এমন পরিস্থিতিতে শাপলার আবেদন- একটি ফুল, যা পানিতে ভাসে এবং জাতীয় প্রতীকের মূল চিহ্ন- অনেক বেশি স্পর্শকাতর একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা এনসিপি চাইছে তাদের প্রতীকে যেন গ্রামীণ আবেগ ও জনসাধারণের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ পায়। তাদের ভাষায়, শাপলা প্রতীকটি শুধু জাতীয় ফুলই নয়, বরং গণআন্দোলনের প্রতীক হিসেবেও মানুষের মানসপটে জায়গা করে নিয়েছে।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে-এই আবেগ কতটা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারযোগ্য? কারণ প্রতীকের আড়ালে প্রকৃত নেতৃত্ব, সংগঠন এবং নীতিই হচ্ছে ভোটারদের আকৃষ্ট করার মূল উপাদান। একমাত্র গ্রহণযোগ্য প্রতীকের কারণে ভোট পেয়ে যাওয়ার দিন হয়তো বাংলাদেশে ফুরিয়ে এসেছে। তাই এনসিপির শাপলার পেছনে লুকানো ‘জনগণের মার্কা’ বা ‘গ্রামবাংলার প্রতিচ্ছবি’র যুক্তি যতই আবেগপ্রবণ হোক, তা কি আদৌ বাস্তব রাজনীতিতে কার্যকর হবে?

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় বলা হয়েছে, জাতীয় প্রতীকের অংশগুলোর ব্যবহারে সরাসরি কোনো আইনগত নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে জাতীয় প্রতীকের ‘মর্যাদা রক্ষার্থে’ কিছু অনানুষ্ঠানিক নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যার ফলে শাপলাকে তফসিলভুক্ত করা হয়নি।

তবে এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠছে, যদি জাতীয় ফল কাঁঠাল কিংবা জাতীয় গাছ বট দলীয় প্রতীক হতে পারে, তাহলে জাতীয় ফুল কেন নয়? এই অসামঞ্জস্যতাই এনসিপির মতো তারুণ্য নির্ভর নতুন দলটির পক্ষে যুক্তি হয়ে উঠেছে। একইসঙ্গে, যদি এক সময় গমের শীষ প্রতীক বাতিল হয় শুধুমাত্র ধানের শীষের সঙ্গে মিল থাকার কারণে, তবে প্রতীকের ভিজ্যুয়াল বিভ্রান্তির প্রশ্নও এখানে অপ্রাসঙ্গিক নয়।

এই বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- প্রতীকের চেয়ে বড় হলো গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা ও সুশাসন। জাতীয় প্রতীক হিসেবে যেসব প্রতীকে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ও ঐতিহাসিক মর্যাদা রয়েছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বা দলীয়ভাবে জবরদখলের মানসিকতা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বিভ্রান্ত করে।

একইসঙ্গে, নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে একটি সুস্পষ্ট আইন বা নির্দেশিকা প্রণয়ন করা, যেখানে স্পষ্ট করে উল্লেখ থাকবে কোন জাতীয় উপাদান রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে ব্যবহারযোগ্য এবং কোনটি নয়। না হলে প্রতিটি জাতীয় এবং স্থানীয় নির্বাচনের আগে এই বিতর্ক আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।

প্রতীকের রাজনীতি যতই আবেগের জায়গা হোক, তার পেছনের যৌক্তিকতা ও আইনগত ভিত্তি আরও স্পষ্ট হওয়া জরুরি। শাপলা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক দলের আকাঙ্ক্ষা যেমন নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়, তেমনি এটি একটি বৃহত্তর প্রশ্ন তোলে-  অনেক ক্ষেত্রে হানাহানির মতো পরিস্থিতিতে জাতীয় প্রতীকের পবিত্রতা প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের হাতে চরমভাবে নষ্ট হবার আশঙ্কা দেখা দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন....