চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শাখা ছাত্রশিবিরের সোহরাওয়ার্দী হল সভাপতি আবরার ফারাবীর নিষিদ্ধ ছাত্রলীগে যুক্ত থাকার বিষয় সামনে এসেছে। রোববার (২১ জুলাই) নিজের ফেসবুক আইডিতে এক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে স্বীকার করেছেন আবরার ফারাবী।
ফেসবুক পোস্টে আবরার লেখেন, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। আমি নিয়ামত উল্লাহ (আবরার ফারাবী)। অধ্যয়ন করছি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের মাস্টার্সে। চলমান কিছু বিতর্ক সামনে আসায় আমি মনে করি, আমার অবস্থান পরিষ্কার করা জরুরি। আপনারা ধৈর্য ধরে পড়লে কৃতজ্ঞ থাকব। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আমি আরবি বিভাগে ভর্তি হয়ে আমার এলাকার এক ভাইয়ের মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী হলে উঠি। কিন্তু মাত্র ২৪ দিনের মধ্যে আমার রুম চারবার পরিবর্তন করা হয়।
কোভিডের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে সবার মতো আমিও বাড়ি চলে যাই। ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর কিছুদিন সোহরাওয়ার্দী হলে এবং ২০২২ সালের ১৭ই জুন পর্যন্ত আব্দুর রব হলে অবস্থান করি। এবং সবার মতো ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গেই হলে থাকি। তবে তখন আমার ছাত্রশিবিরের কোনো দায়িত্বশীলের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না এবং ইচ্ছাকৃতভাবেও করিনি।
ফারাবী বলেন, সে সময় আমার জীবনে কিছু পরিবর্তন আসে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল নামাজে অবহেলা ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন। পরে তাবলিগের ভাইদের সঙ্গে উঠাবসা এবং তালিম-মাশোয়ারায় অংশ নেয়া শুরু করি এবং ছাত্রশিবিরের বর্তমান বায়তুল মাল সম্পাদক মুজাহিদ ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। এবং তার মাধ্যমেই আমি সংগঠনে আসি। এক পর্যায়ে হলে থাকা ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিই।
তিনি বলেন, ২০২২ সালের ২২শে জুন ভারতের নবীন জিন্দাল ও নুপুর শর্মা মহানবী (সা.)-কে অবমাননা করলে চবিয়ান দ্বীনি পরিবার শহীদ মিনারে মানববন্ধনের আয়োজন করে। তৎকালীন প্রশাসন মানববন্ধনের অনুমতি না দেয়ায় আমি তাদের সঙ্গে তর্কে জড়াই। এর ফলে আমাদের তিনজনের স্টুডেন্ট আইডি কার্ড নিয়ে নেয়া হয়। অবশেষে আমরা মানববন্ধন সফলভাবে সম্পন্ন করি। এই ঘটনার জেরে এবং হলে না থাকার কারণে তখন আমাকে শিবিরকর্মী বলে সন্দেহ করা হয়। অথচ তখনও আমি ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যুক্ত হইনি। চবিয়ান দ্বীনি পরিবারের সঙ্গে একে একে দাওয়াতি কার্যক্রম এবং ক্যাম্পাসে ইসলামী পরিবেশ সৃষ্টিতে কাজ করে যাই।
তিনি আরও বলেন, আমার ক্লাস বন্ধ হয়ে গেলেও আমি আমার দাওয়াতি ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাই। তবে মাঝে মাঝে পিঠ বাঁচাতে কিছু পোস্ট করেছিলাম। ২০২৪ সালে যখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইফতার কর্মসূচি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়, তখন আমি মোহাম্মদ আলী ভাইয়ের পরামর্শে চবিতে গণইফতারের ডাক দেই। এতে আমার ছাত্রশিবির পরিচয় প্রকাশিত হয় এবং আমি পুরোপুরি ক্যাম্পাস আউট হয়ে যাই।
নিয়ামত উল্লাহ বলেন, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত আমি সোহরাওয়ার্দী হলের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। ৫ই জুন, সরকার যখন আবারো কোটা পদ্ধতি পুনর্বহালের চেষ্টা করে, তখন চবিয়ান দ্বীনি পরিবারের সঙ্গে মিটিং করে আমরা আন্দোলন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিই। “কোটা পুনর্বহাল চাই না” নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ তৈরি করি। প্রথম দিকে লোকবল একেবারেই কম থাকায় আমাদের জনশক্তিকেই মিছিলে পাঠাই। এরপরের ইতিহাস আপনারা সকলেই জানেন।
নিয়ামত বলেন, এখন বিতর্কিত কিছু বিষয় নিয়ে আমার বক্তব্য। প্রথমত, আমরা কী পোস্ট করব তা আমাদের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হত না। ছাত্রলীগের বড় ভাইয়েরা গ্রুপে পোস্ট দিতেন এবং সবাইকে সেটি শেয়ার ও ট্যাগ করতে বলতেন। আমার সে সুযোগ ছিল না যে পোস্টগুলো কাটছাঁট করব। যেভাবে ওরা লিখত সেভাবেই পোস্ট করতে হত। আর তখনও আমি ছাত্রশিবিরের কোনো ভাইয়ের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম না। তবুও স্বীকার করছি, সেই পোস্টগুলো এবং নিকৃষ্ট শব্দচয়ন করা আমার ভুল ছিল। এজন্য আমি চবি শিবিরের বর্তমান ও তৎকালীন দায়িত্বশীলদের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
অনেকে প্রশ্ন করেছেন: “সেই পোস্ট ডিলিট করিনি কেন?” উত্তর হচ্ছে আমি জানতামই না এমন একটি পোস্ট আমি করেছিলাম। গতকাল বিষয়টি সামনে আসায় দেখলাম। আর আমার আগের আইডিটা আজকে অনেক দিন যাবত আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। একবার হ্যাক হওয়ার পর জিডি করে এপিবিএন পুলিশের মাধ্যমে আইডি উদ্ধার করি এবং এর কিছুদিন পর কোনো এক অজানা কারণে আইডিতে আর লগইন করতে পারিনি।
আজম নাছিরের সঙ্গে ছবির ব্যাপারে বলতে চাই সেটি এসোসিয়েশনের কাজে আমাদের একজন উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে তোলা হয়েছিল। তিনি আজম নাছিরের বন্ধু ছিলেন। ওই ছবিতে রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক অনেক ভাইই উপস্থিত ছিলেন।
শিবির কর্মী বলেন, সারসংক্ষেপে বলব, ছাত্রলীগের সঙ্গে হলে থাকা আমার উচিৎ হয় নাই যদিও এছাড়া দ্বিতীয় অপশন আমার কাছে ছিল না। ক্যাম্পাসের প্রথম দিন থেকেই সচেতন থাকা উচিত ছিল। তবে আমার জানা মতে, আমার দ্বারা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বরং আমার এক রুমমেট সে সময় ছাত্র অধিকার ও আরেকজন ছাত্রদল করত, যা আমি জানতাম এবং তাদের সাহসী কর্মকাণ্ডের জন্য প্রশংসা করেছিলাম। এতক্ষণ সঙ্গে থাকার জন্য ধন্যবাদ।
