উত্তর জনপদে শিক্ষার বাতি ঘর রংপুর কারমাইকেল কলেজ। দেশের অন্য কলেজের তুলনায় মানে এগিয়ে থাকলেও এ বিদ্যাপীঠে সংকট পিছু ছাড়ছে না। ১০৫ বছর বয়সী উত্তরবঙ্গের অক্সফোর্ড খ্যাত এ বিদ্যাপিঠে শিক্ষক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট,
ক্যানটিনে নিম্নমানের খাবার, শিক্ষার্থীদের বাস সংকট, ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের মাদকের আড্ডা, জমি বেদখল ও নিরাপত্তাহীনতাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। শুধু তাই নয় সর্বশেষ ২০১৮সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিংয়ে ৩১টি মানদন্ডে দেশের পঞ্চম
সেরা নির্বাচিত এ কলেজে শিক্ষার্থীদের পড়ার কোনো নির্দিষ্ট স্থান নেই, পাঠাগার থাকলেও সেখানে পর্যাপ্ত বই নেই।
১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজে শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য নেই কোনো অডিটোরিয়াম। এতো সংকটের মধ্যেও কারমাইকেল কলেজটিতে উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি কোর্সের পাশাপাশি স্মাতকে ১৮টি ও স্মাতকোত্তর বিষয়ে ১৬টি বিষয়ে ২১ হাজার শিক্ষার্থীকে পাঠদান করানো হচ্ছে।
কলেজর প্রশাসনিক শাখা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২১ হাজার। এর বিপরীতে শিক্ষক আছেন ১৯৫ জন। হিসেব অনুযায়ী গড়ে ১০৮জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক একজন পাঠদান করান। এছাড়াও সৃষ্টপদের বিপরীতে কলেজে শিক্ষক সংকট আছে ৫৩জন। এর মধ্যে আইসিটি বিভাগে ১২ শিক্ষক পদের বিপরীতে শূন্য ১১ পদ, ফিন্যান্স বিভাগে ১২ পদের বিপরীতে ৯, মার্কেটিং বিভাগে ১২ পদের বিপরীতে ১০, সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ১২ পদের বিপরীতে ১০, দর্শন বিভাগে ১২ পদের
বিপরীতে ৫ ও ইসলামের ইতিহাস বিভাগে ১২ পদের বিপরীতে ৮ শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।
কলেজটিতে ২১ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে ৭টি হলে মাত্র এক হাজার আসন রয়েছে। বাকি ২০ হাজার শিক্ষার্থীকে কলেজ ক্যাম্পাসের আশেপাশে মেস ও ভাড়ায় থাকতে হয়। বসবাসের অনুপোযোগী হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদের ওসমানি ও কারমাইকেল হল দুটি বন্ধ রয়েছে। নির্মাণ কাজ শেষ হলেও সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়নি আরও দুটি হলে। ফলে আবাসন সংকটে ভুগছে শিক্ষার্থীরা। ৭টি হলের মধ্যে বর্তমানে গোপাল লাল(জিএল) ও কাশিম বাজার(কেবি) হলে ১৯৬জন ছাত্র বসবাস করেন। সিট বরাদ্দ পেলে ছাত্রদের জন্য
নির্মাণ করা নতুন শেখ কামাল হলে আরও ১৩২জন ছাত্র বসবাস করতে পারবেন। ছাত্রীদের জন্য চারটি হল থাকলেও বর্তমানে তিনটিতে ৬১০জন বসবাস করতে পারেন। এর মধ্যে বেগম রোকেয়া ছাত্রী নিবাসে ১৫৬, তাপসী রাবেয়া ছাত্রীনিবাসে ৩৫৪ ও জাহানার ইমাম ছাত্রী নিবাসে ১০০জন বসবাস করেন। এছাড়াও ১৩২ সিটের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেছা ছাত্রীনিবাসের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। কিš‘ সিট বরাদ্দ না দেওয়ায় এখনো সেখানে ছাত্রীরা উঠেনি। ফলে আবাসনসংকট কাটছে না। আবাসন
সংকটের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত পরিবহন ব্যবস্থা নেই।
শতবর্ষী এ কলেজে ২১ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য ৩টি বাস অপ্রতুল। বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, পীরগাছা ও কাউনিয়ার শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য আরও চারটি বাস প্রয়োজন বলে জানান কারমাইকেল কলেজের প্রধান সহকারি হাবিবুর রহমান। শুধু শিক্ষক সংকট, আবাসন সংকট ও পরিবহনে বাস সংকটই নয়, ক্যানটিনের খাবারও নিম্নমানের। আসবাবপত্রও ভাঙাচোরা। এমন কি শিক্ষকেরাও থাকেন পরিত্যক্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে। কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জাহিদ হাসান দিপু বলেন, আমরা পরিত্যক্ত আবাসিক বাসভবনে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছি। কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ এই আবাসিক ভবন সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। কারমাইকেল কলেজের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আল মাহামুদ বলেন, ক্যানটিনে খাবার মান ভাল না, অথচ খরচ অনেক বেশি। পুরোনো অব্যবহার যোগ্য আসবাবপত্র খাবার সরবরাহও করা হয়।
বর্তমানে ২০৩ একরের এই কলেজ ক্যাম্পাসে নির্দিষ্ট কোনো সীমানাপ্রাচীর নেই। ফলে নিয়মিত সকাল সন্ধ্যা বহিরাগতদের আনাগোনা চলে। বসে মাকদসেবীদের আড্ডা। ফলে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন শিক্ষার্থীরা। অনেক সময় বহিরাগতদের আক্রমণের শিকারও হন শিক্ষার্থীরা। যার উদাহরণ গত ১৯ ফেব্রæয়ারি বহিরাগতদের সঙ্গে
শিক্ষার্থীদের সংর্ঘষের ঘটনা। তু”ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জিএল হলে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঢুকে শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালায় বহিরাগতরা। ভাঙচুর করে হোস্টেল ক্যানটিনের আসবাবপত্র। এ ঘটনায় প্রায় ১০জন শিক্ষার্থী আহত হয়। এরপর থেকেই কলেজ ক্যাম্পাসে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সীমানাপ্রাচীর ও পুলিশ ফাড়ি স্থাপনের জোরালো দাবি জানাচ্ছেন।
কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীর এসমোতারা আক্তার বলেন, সকাল সন্ধ্যা ক্যাম্পাসে বহিরাগতরা বেপরোয়াভাবে চলাচল করেন। ভয়ে ভয়ে চলতে হয়। এখানে স্থায়ী কোনো পুলিশ ফাঁড়ি ও সীমানাপ্রাচীর না থাকায় বহিরাগতরা মাদক সেবন, শিক্ষার্থীদের মারধর ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটনা। এতো পুরোনো এতিহ্যবাহী এ কলেজে ১০৫ বছরেও কোনো পুলিশ ফাঁড়ি হয়নি এটা দুঃখজনক। কারমাইকেল কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও কৃষি কমিটির সদস্য তানজিউর রহমান জানান, কারমাইকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার শুরুতে ৩০০ একর জমি থাকলেও বতর্মানে রয়েছে মাত্র ২০৩ একর। এর মধ্যে বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ের অধিগ্রহণ করেছে ৭৫ একর ও রংপুর ক্যাডেট কলেজ ২২ একর। ২০৩ একরের মধ্যে কলেজ ক্যাম্পাসে দুর্বৃত্তরা দখল করে রেখেছে ২ একর জায়গা।
অধ্যাপক তানজিউর রহমান বলেন, স্থানীয় ব্যবসায়ী দুই একর জায়গা দখলে নিয়েছে।
এগুলো উদ্ধারের চেষ্টা করছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। সংকট, দখল ও নিরাপত্তাহীনতার বিষয়ে জানতে চাইলে কারমাইকেল কলেজের অধ্যক্ষ ড. আমজাদ হোসেন বলেন, কলেজে নানা সংকট রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান হলো শিক্ষক সংকট, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট, অডিটোরিয়াম, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে বাস সংকট রয়েছে। এগুলো সমস্যা সমাধানের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হ”েছ। হলের খাবারের বিষয়ে খোঁজ খবর নিব। ক্যাম্পাসে কোনো মাদকের আড্ডা বসে না বলে তিনি দাবি করেন।
