নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ২৪টি বিভাগ রয়েছে সেগুলোর শিক্ষার্থীদের সংকুলানের পর্যাপ্ত জায়গা নেই। সব বিভাগের জন্য পূর্ণাঙ্গ শ্রেণীকক্ষ না থাকায় অনেক বিভাগকেই কক্ষ ভাগাভাগি করে পাঠদানের কাজ সম্পন্ন করতে হয়। এর পরেও সমাজকর্ম নামে নতুন একটি বিভাগ চালু করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আবার নিয়মবহির্ভূতভাবে চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকেই বিভাগটিতে শিক্ষার্থী ভর্তির জরুরি বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছে। একটি সূত্র বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. ছাদেকুল আরেফিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। সে কারণে তারই আগ্রহে নতুন এ বিভাগ স্থাপনের পাশাপাশি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় ঘটিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, উপাচার্য অধ্যাপক ড. ছাদেকুল আরেফিনের উদ্যোগে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) থেকে সমাজকর্ম বিভাগের অনুমোদন পাওয়া যায়। এ বিভাগে চুক্তিভিত্তিক তিনজন শিক্ষকসহ মোট ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের কথা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কোনো জনবলই নিয়োগ হয়নি। এমনকি ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার সার্কুলারে সমাজকর্ম বিভাগের নামও উল্লেখ ছিল না। এ পরীক্ষায় বিষয় নির্বাচনের জন্য সময় নির্ধারিত ছিল গত বছরের ১৭ থেকে ২৭ অক্টোবর। সে ফরমেও ছিল না সমাজকর্ম বিভাগের নাম।
গত ১ ফেব্রুয়ারি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ক্লাস কার্যক্রম। বিভিন্ন বিভাগে ক্লাস করতে শুরু করেছেন শিক্ষার্থীরা। এরই মধ্যে সমাজকর্ম বিভাগে ৩০ আসনে শিক্ষার্থী ভর্তির জরুরি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গত সোমবার ভর্তি পরীক্ষা কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. মো. মুহসিন উদ্দীনের সই করা ওই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র বলছে, মূলত উপাচার্যের আগ্রহেই নতুন বিভাগ খোলাসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে জানতে যোগাযোগ করা হলেও উপাচার্যের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে ইউজিসির সচিব ড. ফেরদৌস জামান বলেন, ‘এখানে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী নতুন এ বিভাগের সার্কুলার হওয়ার কথা আগামী বছর ভর্তি পরীক্ষার সময়। কারণ ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের যে গুচ্ছ পরীক্ষা থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে সে সময় সমাজকর্ম বিভাগের অনুমোদন হয়নি। এ বিভাগের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষকও নিয়োগ হয়নি। তাহলে কীভাবে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয় আমি বুঝতে পারছি না। এটি অনৈতিক, কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়।’
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ও ভর্তি পরীক্ষা কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. মো. মুহসিন উদ্দীন জানান, গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের বিষয় নির্বাচন ফরম পূরণের সময় সমাজকর্ম বিভাগের অনুমোদন হয়নি। তাই তখন এ বিভাগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়া সম্ভব হয়নি। যেহেতু চয়েস ফরম পূরণের নির্ধারিত তারিখ শেষ হয়েছে এবং সে তালিকা থেকে ভর্তি কার্যক্রম প্রায় শেষ তাই নতুন এ বিভাগের জন্য শিক্ষার্থী ভর্তির বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে।
এ বিভাগে এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষক নিয়োগ দেয়া না হলেও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অসীম কুমার নন্দীকে সমাজকর্ম বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলে জানান ড. মো. মুহসিন উদ্দীন।
গত ৩০ জানুয়ারি এক অফিস আদেশের মাধ্যমে সমাজকর্ম বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান সহযোগী অধ্যাপক অসীম কুমার নন্দী। বিভাগের নিজস্ব শ্রেণীকক্ষ বা শিক্ষক এখন পর্যন্ত নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে কবে শিক্ষক নিয়োগ হবে সে বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত জানি না। কেবলই বিভাগ শুরু হয়েছে। সামনে হয়তো শিক্ষক নিয়োগ হবে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। এখন যদি নতুন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় তাহলে তারা একাডেমিক পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়বেন। কারণ বিজ্ঞপ্তির পর ভর্তি প্রক্রিয়া, শিক্ষক নিয়োগসহ বিভাগের কার্যক্রম শুরু হতে অন্তত দুই-তিন মাস সময় প্রয়োজন। এছাড়া শিক্ষক নিয়োগ কবে হবে সে সম্পর্কে রেজিস্ট্রার, ভর্তি কমিটির সদস্যসহ সংশ্লিষ্টরা কেউই নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেন না। ফলে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হলে তাদের সামনে থাকবে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাহাত হোসাইন ফয়সাল বলেন, ‘গত ১ ফেব্রুয়ারি নতুন শিক্ষাবর্ষের সব বিভাগের ক্লাস কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আমরা শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা নিয়েছি। সেখান থেকেই যোগ্য শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হবে। যেহেতু সমাজবিজ্ঞান বিভাগ নামে একটি বিভাগ রয়েছে আর সমাজকর্ম ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের পাঠ্যক্রম খুব কাছাকাছি তাই প্রথম বর্ষে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় তেমন কোনো ক্ষতি হবে না।’
শিক্ষক, শ্রেণীকক্ষ ছাড়াই একটি বিভাগে কীভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগ হবে আর ক্লাসরুম বিষয়ে হয়তো প্রশাসনের পরিকল্পনা রয়েছে। সে অনুযায়ীই কাজ করা হবে।
