কীর্তনখোলা নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত বরিশাল সিটি করপোরেশনের মোট ভোটারের ২ লাখ ৭৬ হাজার ২৯৮ জন। আজ সোমবার (১২ জুন) এই নগরে প্রথমবারের মতো সবকটি কেন্দ্রে ইভিএম পদ্ধতিতে যে ভোট হতে হচ্ছে, তাতে সুষ্ঠু ভোটের ব্যাপারে শুরু থেকেই আশাবাদ ব্যক্ত করে আসছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবুল খায়ের খোকন সেরনিয়াবাত।
বিপরীতে প্রচার-প্রচারণার শুরু থেকেই আশঙ্কার কথা বলে আসছেন নৌকার প্রধান তিন প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মুফতি ফয়জুল করিম, জাতীয় পার্টি (জাপা) প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস, স্বতন্ত্র পার্থী কামরুল আহসান রুপন। বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার অবস্থানে অটল থাকায় প্রার্থী দেয়নি বিএনপি। তবে বিএনপি থেকে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী কামরুল আহসান রুপন ও সাধারন কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে অংশ নেয়া ১৮ জন কাউন্সিলরকে স্থায়ী ভাবে দল থেকে বহিস্কার করা হয়েছে।
এদিকে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে আশা-শঙ্কার দোলাচলের কথা জানিয়েছেন সাধারণ ভোটাররাও। এমন পরিস্থিতিতে মেয়র ও কাউন্সিলর বেছে নিতে সোমবার ভোট দেবেন তারা।
নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণার শেষ দিন ছিল শনিবার। এদিন মধ্যেরাত পর্যন্ত মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে প্রচারণায় ব্যস্ত সময় কাটান। দিনের পুরোটা সময় ভোট চেয়ে প্রতীকের পরিচিতি জানিয়ে প্রার্থীদের পক্ষে মাইকিং করা হয়।
সে তুলনায় রোববার (১১জুন) ভোটের আগের দিনটা ছিল অনেক নিস্তরঙ্গ। পথে-ঘাটে প্রার্থী কিংবা তাদের কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল না। বরং এদিন দুপুর থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে ইভিএমসহ ভোটের বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম বুঝে নিতে ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তৎপর দেখাগেছে।
রোববার (১১জুন) সকালে বরিশাল শিল্পকলা একাডেমী থেকে বিভিন্ন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা এসব সরঞ্জাম নেন। আর পথে পথে দেখা যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল।
আশার বিপরীতে শঙ্কা : উন্নয়নের প্রশ্নে বিএনপির সমর্থকরাও আমাকে ভোট দিবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত।
রোববার (১১ জুন) দুপুরে নগরীর সদররোডস্থ আওয়ামী লীগ প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এ কথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, সবকিছু ম্যান টু ম্যান ভেরি করে। বিজয়ী হলে বরিশালের উন্নয়ন করার নিশ্চয়তা আমি দিয়েছি। যার কারণে জনগণ আমাকে ভোট দিবে বলে আমি বিশ্বাস করি। সেইসঙ্গে বিএনপির সমর্থকরাও মনে করছে আমাকে ভোট দিতে পারলে নগরবাসী সেবা পাবে। দল-মত নির্বিশেষে সব মানুষ স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে আমাকে ভোট দিবে।
এ সময় নির্বাচনের পরিবেশ আর প্রতিপক্ষ প্রার্থীর বিভিন্ন অভিযোগ খÐন করে তিনি বলেন, যেহেতু আমি আওয়ামী লীগের প্রার্থী, আমার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ থাকতেই পারে, করতেই পারে। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে সবকিছু স্বাভাবিক ও চমৎকার পরিবেশ দেখতে পাচ্ছি। এখানে কোনো অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পাচ্ছিনা।
একইদিনে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে শঙ্কার কথা জানিয়ে বিএনপির বর্জনের মধ্যে নির্বাচনে স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা বরিশাল সিটি করপোরেশনের বিএনপির সাবেক মেয়র আহসান হাবীব কামালের ছেলে কামরুল আহসান রুপন জানান, ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতিও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। আমাদের সুষ্ঠ ভোট নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। একই কথা জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মুফতি ফয়জুল করিম।
অপরদিকে নির্বাচনীয় এলাকায় এখনও বহিরাগতের উপস্থিতি ও গোয়েন্দাদের সরকারি দলের পক্ষে অবস্থান নির্বাচন ২০১৮ সালের দিকে নিয়ে যাওয়ার আশংকা প্রকাশ করে রোববার (১১ জুন) সকালে সংবাদ সম্মেলনে করছেন জাতীয় পার্টি জাপা প্রার্থী প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন তাপস।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আমরা শুনেছি রাতের অন্ধকারে কলোনি গুলোতে কালো টাকা নিয়ে নৌকার সমর্থকরা ভোটারদের কাছে যাচ্ছে। এসময় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়ররা সাথে থাকছে। তারা (নৌকা) এখনো তাদের বাহিনী নিয়ে নগরীতে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাচ্ছে। গতকাল (১০জুন) শেষ প্রচারনায় দেখেছেন পঙ্কজ দেবনাথ এমপি কিভাবে প্রকাশ্যে মহড়া চালিয়েছে আর দায়িত্বশীলরা নিরবতা পালন করছেন। বিভিন্ন হোটেল ও মোটেলে বহিরাগতরা এখনও অবস্থান করছে। তারা এখনো কি চাই?তিনি আরো বলেন,১নং ওয়ার্ডের জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক চুন্নুকে হুমকি দিয়েছে সাদাপোষাকধারিরা। তারা হুমকি দিয়ে বলেছে কেন্দ্রে গেলে হাত-পা ভেঙে দেওয়া হবে। আজ রাতে কি হতে পারে আমি জানিনা। তবে আমি সিইসির কাছে অনুরোধ করছি, এখনো সময় আছে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করুন। বরিশাল পুলিশ কমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, বহিরাগতদের বের করার ব্যাবস্থা গ্রহণ করুন।
তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আরও বলেন, ২০১৮ ও ২০২৩ একই ফ্রেমে বাঁধা। দু’জনই প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়। আর সে কারনে সর্বশেষ প্রচাারনায় ‘খোকন সেরনিয়াবাত বলেছেন -আমাকে উন্নয়নের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছে প্রধানমন্ত্রী’ আর এই বক্তব্যের প্রতিফলন দেখছি বিভিন্ন সংস্থা ও বাহিনী নৌকার মাঝিকে মেয়র করার জন্য সবকিছুই করছে। গাজীপুরে কাজ হয়নি এখানেও কাজ হবেনা। ভোটারদের ¯্রােত কেউ ঠেকাতে পারবে না। তিনি বলেন,আমি কাউকে ভয় করিনা, আমি মাঠে আছি, থাকবো।আমার মৃত্যু হলে ভোট কেন্দ্রে হবে। আমি আমার ভোটারদের ফেলে কোথাও যাব না।
ভোটের মাঠে ১৬৫ প্রার্থী : বরিশাল সিটি নির্বাচনে এবার ৭ মেয়র প্রার্থীসহ সংরক্ষিত কাউন্সিলর ও সাধারণ কাউন্সিলর পদে মোট ১৬৫ জন সরাসরি ভোটযুদ্ধে আছেন। এর মধ্যে মেয়র পদে ৭ জন, সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৪২ জন এবং সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১১৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
মেয়র পদে প্রার্থী যারা : নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত, লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পাটির ইকবাল হোসেন তাপস, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুফতি ফয়জুল করিম, গোলাপ ফুল প্রতীকে জাকের পার্টির মিজানুর রহমান বাচ্চু, স্বতন্ত্র পদে টেবিল ঘড়ি প্রতিকে কামরুল আহসান রুপন, হাতী প্রতিকে আসাদুজ্জামান, হরিণ প্রতীকে আলী হোসেন হাওলাদার
মেয়র প্রার্থীরা ভোট দেবেন যে কেন্দ্রে : বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছেন সাতজন। ভোটের শুরুতেই প্রার্থীরা সবাই নিজ নিজ কেন্দ্রে ভোট দেবেন।
এরমধ্যে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের মেয়র প্রার্থী আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত নগরের কালিবাড়িরোডস্থ সরকারি বরিশাল কলেজ কেন্দ্রে, জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকের প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস গোরস্থান রোডের সৈয়দ আব্দুল মান্নান ডিডিএফ আলিম মাদরাসা কেন্দ্রে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের মেয়র প্রার্থী মুফতী সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম বরিশাল নগরের রূপাতলী হাউজিং আ. রব সেরনিয়াবাত মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে, জাকের পার্টির গোলাপফুল প্রতীকের মেয়র প্রার্থী মো. মিজানুর রহমান বাচ্চু ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের চহুতপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেবেন। এছাড়া টেবিলঘড়ি প্রতীকের স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী কামরুল আহসান রুপন কালুশাহ সড়কের আলেকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে, হরিণ প্রতীকের স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী মো. আলী হোসেন হাওলাদার ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের চহুতপুর ইস্কান্দার শরীফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, হাতি প্রতীকের স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী মো. আসাদুজ্জামান বরিশাল নগরের সদররোডের সিটি কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেবেন।
