মা ইলিশ রক্ষাসহ সব ধরনের মাছ আহরণের সরকারের দেয়া ২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে আজ মধ্যরাতে। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় দেশের উপকূলীয় জনপদ বরগুনার বেতাগীতে বিষখালী নদীর পাড়ের জেলেদের মাছে বইছে আনন্দের বন্যা।
বিষখালী নদীর তীরবর্তী একটি পৌরসভা সহ ৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত উপক’লীয় এ উপজেলায় ৩ হাজারেরও বেশি জেলে ইলিশ মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। এবছর নদীতে জাল ফেললেই ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়বে এমন স্বপ্ন দেখছেন তারা। জেলেরা আশা করছেন এবারে তারা প্রচুর ইলিশ পাবেন। স্থানীয় মৎস্য বিভাগ দাবি করেছেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ায় ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে এবং মা ইলিশ নিরাপদে মিঠাপানিতে ডিম ছাড়ার সুযোগ করে দিতে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলার সদর ইউনিয়নের ঝোপখালী, কেওড়াবুনিয়া, মোকামিয়া ইউনিয়নের ছোট মোকামিয়া, বুড়ামজুমদার ইউনিয়নের বদনীখালীখালী ও সড়িষামুড়ি ইউনিয়নের কালিকাবাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, মাছ শিকারের জন্য নদীতে নামতে যেন আর তর সইছে না জেলেদের। জেলেরা ব্যস্ত সময় পাড় করছেন। যাবার প্রস্তুতি হিসাবে কেউ নৌকা মেরামত করেছে, কেউবা করেছে জাল মেরামত। আবার কেউ কেউ ঘর থেকে জালের বস্তা নদীর পাড়ে নিয়ে আসছেন। পাশাপাশি বিষখালী নদীর পাড়ে ডকে নোঙর করে রাখা নৌকাগুলোতেও চলছে ধোয়া-মোছার কাজ।
উপজেলার ঝোপখালী গ্রামের জেলে হাদীসুর রহমান জানান, যখন নদীতে মাছ আহরণ নিষেধ থাকে, তখন তিনি জাল মেরামত করার কাজ করেন। আবার নদীতে নামবেন। তাই ভোর থেকেই জাল মেরামত করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
উপজেলার কালিকাবাড়ি গ্রামের জেলে মো: আসাদুল জানান, সরকার মা ইলিশ রক্ষায় যে অভিযান দিয়েছে, তা আমরা মেনেছি। আমরা এতদিনে নদীতে নামি নাই। এখন যদি সৃষ্টিকর্তা কিসমতে রাখে তাহলে ইলিশ পাব। আর না পেলেতো দেনার মধ্যে থাকতে হবে।
আরেক জেলে মো. শামীম জানান, নিষেধাজ্ঞার কারণে কিছুদিন অবসরে ছিলাম। সরকার যে ২৫ কেজি করে চাল দিয়েছে তা পেয়েছি। তবে এই দিয়ে তো আমাদের সংসার চলে না। এখন আবার ইলিশ ধরার জন্য আতোমধ্যে জালগুলো প্রস্তুত করে ফেলেছি।
বেতাগী উপজেলা মৎস্যজীবি সমিতির সভাপতি আব্দুর রব সিকদার বলেন, মাছ ধরার ওপর দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরুর পর থেকেই বিষখালীনদীর তীরবর্তী কালিবাড়ি বাজার ও এখানকার জেলে পাড়া মাছের জন্য খা খা করে আসছিলে। কিন্ত আজ মধ্যরাত থেকে তার অবসান হওয়ায় এখানকার জেলেপল্লীগুলোতে আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসছে। উপজেলার ও আশে-পাশের বিভিন্ন এলাকার মাছ কিনতে এখানে প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটবে।
এদিকে অভিযান ও মোবাইলকোর্ট পরিচালনা করে উপজেলা মৎস্য বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন, নৌ বাহিনী, থানা ও নৌ-পুলিশ, উপজেলা টাস্কফোর্সের অভিযানে আটক ও জাল পুড়ে ধংস করা হলেও অনেক জেলে তা মানেনি। আতাউর রহমানসহ স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, মা ইলিশ সংরক্ষণের শেষ পর্যায় এসেও একশ্রেণির জেলেরা কোনভাবেই থেমে ছিল না। তারা প্রতিদিনই প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কম-বেশি ইলিশ ধরেছে।
উপজেলা মৎস্য অফিস জানায়, সর্বশেষ ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জাল ফেলায় অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ইতোমধ্যে তিন লাখ ৬০০ টাকা মূল্যর ৯ হাজার ৩০০ মিটার অবৈধ জাল জব্দ ও প্রকাশ্যে পুড়িয়ে ধংস করা হয়েছে এবং ২৮টি অভিযান ও ৪টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়।
উপজেলার সদর ইউনিয়নের ঝোপখালী গ্রামের জেলে মো: শাহীনসহ একাধিক জেলে জানান, মাছ শিকারে সরকারের নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারের দেয়া সহায়তা যথেষ্ঠ নয়। তাই পরিবারের খরচ যোগাতে অনেকেই বিপাকে পড়তে হয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে দার-দেনা এমনকি এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়। কাঙ্খিত মাছ না পেলে ঋণ শোধ করা নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে। তা নিয়েও আমারমত অনেকেরই চিন্তার শেষ নেই।
বেতাগী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারুক আহমদ বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়েও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ায় এবারে ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণ হবে। জাতীয় সম্পদ ইলিশ রক্ষায় আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। অভিযানে গিয়ে আমাদের বেশকিছু জাল আটক ও ধংস করা হয়েছে। ইলিশ মাছ নিরাপদে ডিম ছাড়লে জেলেরাই তা আহরণ করে লাভবান হবে।
বেতাগী উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সমাত্বি সাহা জানান, প্রজনন মৌসুম উপলক্ষে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞাসহ পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে এখানে নদীতে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। এতে জেলেরাই তার সুফল ভোগ করবে ও লাভবান হবে।
