অব্যবস্থাপনা, শিক্ষক সংকট ও নানা অনিয়মের কারণে ধ্বংসের মুখে পড়েছে নড়াইল কৃষি ও কারিগরি কলেজ। জেলার একমাত্র বিশেষায়িত এই কলেজে গেল ৪ বছরে যেখানে আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থী অধ্যায়ন করতেন, সেখানে বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা নেমে এসেছে একশর নিচে। নিয়মিত শিক্ষক আছেন মাত্র ৪ জন, আর কর্মচারী ২ জন।
স্থানীয় উদ্যোগে ২০০৫ সালে কৃষিপ্রধান মুলিয়া এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় এ বিশেষায়িত কলেজটি। শুরুতে আশেপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হলেও বর্তমানে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। সেমিষ্টারে ৬০জন ভর্তি হলেও পরীক্ষীয় অংশ নেয় অর্ধেক। নামমাত্র ভর্তি হলেও ক্লাসে উপস্থিতি নেই বললেই চলে।
গত ৪ আগষ্ট সরেজমিনে কলেজ পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, চারটি সেমিস্টারে মোট ৯৫ শিক্ষার্থী থাকলেও কেউ উপস্থিত নেই। কিছু কক্ষের তালা দিনের বেলাতেই খোলা হয়নি। কেবল অধ্যক্ষের কক্ষে কয়েকজন শিক্ষক অবস্থান করছিলেন, বাইরে ঘোরাফেরা করছিলেন একজন নৈশপ্রহরী। কলেজের জমিদাতা ও বর্তমান নাইটগার্ড টিকেন বিশ্বাস বলেন, সকালে বৃষ্টি হয়েছিল, তাই কেউ আসেনি।
শিক্ষক চন্দন কুমার রায় ক্লাসের অপেক্ষায় অধ্যক্ষের কক্ষে বসে আসেন। ক্লাস না হওয়া বিষয়ে তিনি বলেন, ভর্তি হয়েছে ৫০ জন পরীক্ষা দিছে ৩৪ জন বাকিরা কিন্তু ঝরে গেছে। মাঝে মধ্যে এরকম ছাত্র-ছাত্রী শূন্য হয়ে যায়।
স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথে যোগাযোগ করলে তারা জানান, বসার ভালো ব্যবস্থা নেই, টয়লেট নেই, ফলে অনেকে ভর্তি হয়ে আর আসে না বা ঝরে পড়ে।
শিক্ষক দিপা রানী বিশ্বাস বলেন, কলেজের টিনের চাল দিয়ে পানি পড়ে, লেখাপড়ার পরিবেশ নাই, শিক্ষার্থীদের জন্য টয়লেটের ব্যবস্থা নাই, তাই ছাত্রছাত্রী কমে গেছে, আবার আসলেও থাকতে চায় না। আমরা ফোন করে শিক্ষার্থীদের হাজির করি।
জানা গেছে, ২০১৯ সালের জুলাই থেকে কলেজটি এমপিও কার্যকর হয়। তবুও পূর্ববর্তী অধ্যক্ষ সসীম সরকার যিনি আব্দুল হাই সিটি কলেজের সহকারী অধ্যাপক নিয়ম বহির্ভূত ভাবে তিনি কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক দ্বায়িত্ব পালনে ২০২১ সাল পর্যন্ত কলেজের ব্যাংক হিসাব ও পরিচালনা করেন (সোনালী ব্যাংক, রূপগঞ্জ শাখা-সঞ্চয়ী-৩৩৮০১)।
কলেজের বর্তমান ছাত্রছাত্রী কাগজে ৪ সেমিষ্টার মিলিয়ে মোট ৯৫ জন, ভর্তির সময় এই সংখ্যা ছিলো ১’শ৬৮ জন। ২০২১ সালে আরও একবার প্রবীণ একজনকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যিনি বর্তমানে ৭৬ বছর বয়সী রমেশ চন্দ্র বিশ্বাস। তিনি নিজেই স্বীকার করেন, বাস্তবে অধ্যক্ষ হবার যোগ্যতা আমার নেই, কেবল রেজুলেশনের মাধ্যমে এখানে আছি।
শিক্ষক সন্দীপ কুমার বিশ্বাস বলেন, আমরা কৃষি বিষয়ে পারদর্শী না হয়েও পড়াতে বাধ্য হচ্ছি। পূর্ণাঙ্গ শিক্ষক না থাকায় শিক্ষা কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা নেই।
এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, নড়াইল হেলথ অ্যান্ড এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন নামের একটি সংগঠন কলেজের জমি, নিয়োগ ও কাগজপত্র নিয়ন্ত্রণ করছে। ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক সসীম সরকার—যিনি কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য—তিনি কলেজের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিজ বাড়িতে রাখেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কলেজ প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক তরফদার সাজ্জাদ হোসেন টিপু বলেন, আমি শুরুতে কলেজ গঠনে ছিলাম, কিন্তু ফাউন্ডেশনের কার্যকলাপ দেখে সরে দাঁড়াই।
নড়াইল হেলথ এন্ড এডুকেশন ডেভেলপমেনট ফাউন্ডেশনের সাধারন সম্পাদক সসীম কুমার সরকারকে এ বিষয়ে জানার জন্য ফোন করলে তিনি সরাসরি কথা বলতে চাইলেও পরে যোগাযোগ করেননি। ২য় দফা ফোন করলে বলেন,তদন্তের পর বলবো।
কলেজের অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে এটা স্বীকার করে পরিচালনা কমিটির সভাপতি ভগীরথ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, কলেজ নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র চলছে, একজন পরিপূর্ন অধ্যক্ষ নিয়োগ দিতে না পারার কারনে এমন হচ্ছে।
ইতিমধ্যে অব্যস্থাপনা বিষয়ে জেলা প্রশাসন থেকে শিক্ষা ও কৃষি পর্যায়ের ৮ সদস্যের একটি উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২৯ জুলাই তদন্ত কমিটির সকল সদস্য কলেজের নানা বিষয় পরিদর্শন করে ইতিমধ্যে নানা অনিয়মের ঘটনা পেয়েছে।
তদন্ত কমিটির আহবায়ক অতিঃ জেলা প্রশাসক(শিক্ষা ও আইসিটি) মো.আহসান মাহমুদ রাসেল বলেন, কলেজে শিক্ষার্থী সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে, অবকাঠামো সুবিধা নাই। লেখাপড়ার মান কমে গেছে এটা ধারনা করা যায়। তদন্ত শেষ হলে সব বলা যাবে।
