ঢাকা শনিবার , ৯ আগস্ট ২০২৫
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ফরিদপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী গোলাম নাছির গ্রেপ্তার

আইএম নিউজ ডেস্ক
আগস্ট ৯, ২০২৫ ৩:৪৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ফরিদপুরের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী জেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি গোলাম নাছিরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার বেলা ১১টায় তাকে ফরিদপুরের আদালতে নেয়া হলে আদালত তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করেন। শুক্রবার (৮ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর পল্লবীতে স্থানীয় জনতা গণধোলাই দিয়ে তাকে থানায় সোপর্দ করে।

ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ওসি মো. আসাদউজ্জামান জানান, পল্লবী থানা পুলিশের সহযোগিতায় ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার পুলিশ শনিবার ভোরে গোলাম নাছিরকে ফরিদপুরে নিয়ে আসে। ফরিদপুরের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক নেতার দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে তাকে ফরিদপুরের এক নং আমলি আদালতে প্রেরণ করে পুলিশ। মামলার বাদী মুজাহিদুল ইসলাম।

ওসি বলেন, পল্লবীতে শুক্রবার দুপুরে স্থানীয় জনতা আসামি নাছিরকে গণধোলাই দিয়ে পল্লবী থানা পুলিশে সোপর্দ করে। পরে রাতে খবর পেয়ে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার পুলিশের একটি দল পল্লবী থানায় যায়। এরপর সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ আসামিকে ফরিদপুরের ১নং আমলি আদালতে প্রেরণ করলে আদালত আগামী ১৮ আগস্ট শুনানি হবে উল্লেখ করে তাকে ফরিদপুর কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ফরিদপুর জেলার সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি গোলাম নাছির (৫২)। তিনি ফরিদপুরে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরাসরি তার বাহিনী নিয়ে হামলায় অংশ নেন। আন্দোলন চলাকালে ঢাকায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতেও দলবল নিয়ে অংশ নিতেন। তার বিরুদ্ধে ঢাকা ও ফরিদপুর কোতোয়ালি ও ভাঙ্গায় ছাত্র হত্যা ও হামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে পাঁচটি মামলা রয়েছে।

গত বছরের ৩ ও ৪ আগস্ট ফরিদপুরের ভাঙ্গা রাস্তার মোড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিলে নাছিরের নেতৃত্বে সশস্ত্র হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পালিয়ে যান এই ক্যাডার। হামলায় আহতদের পক্ষ থেকে সম্প্রতি ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় দুটি মামলায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ফরিদপুর মোটর ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের অধিগ্রহণকৃত জমির অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণের ৮৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ইউনিয়নের তৎকালীন সভাপতি জুবায়ের জাকির ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম নাছিরের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গত ১ নভেম্বর ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানায় মামলাটি করেন সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক।

পলাতক থাকা অবস্থায় ভোল পাল্টে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস প্রধান অতিথি, এমন একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রেখেছেন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরাসরি হামলায় অংশ নেয়া পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী গোলাম নাছির। শুধু নাছির একা নন, অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করতে দেখা গেছে জেলা শ্রমিক লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. জুবায়ের জাকিরকে। পুলিশ খুঁজে না পেলেও, এমন একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে দেখে অবাক হয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ১৬ জানুয়ারি বেলা ১১টায় রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন আয়োজিত কেন্দ্রীয় কমিটির ওই বর্ধিত সভায় সভাপতিত্ব করেন ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবদুর রহিম বক্স দুদু। বিশেষ অতিথি ছিলেন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবির খান। ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে গা ডাকা দেন নাছির।

পুলিশের গত দুই যুগের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী আশরাফুল আলম নাছির ওরফে গোলাম নাছির। ফরিদপুর শহরের ওয়্যারলেসপাড়ার এই বাসিন্দা ফরিদপুরবাসীর কাছে ছিলেন মূর্তিমান আতঙ্ক। সন্ত্রাস, হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, বিস্ফোরক বোমা প্রস্তুত, অবৈধ অস্ত্রের সরবরাহসহ অনেক মামলার আসামি তিনি। রয়েছে মাদক ব্যবসার বিশাল নেটওয়ার্ক ও সিন্ডিকেট। দু’হাতে কামিয়েছেন অবৈধ অর্থ। এভাবে গত ৩০ বছরে সন্ত্রাসী থেকে নামে-বেনামে শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন এই নাছির।

একের পর এক অপরাধে যুক্ত হয়ে পুলিশের কালো তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী হলেও বিভিন্ন কৌশলে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছেন। রাস্তার বখাটে থেকে প্রথমে জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি এবং পরে ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সর্বশেষ ফরিদপুর জেলা জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতিও হন তিনি। টাকা আর অস্ত্রের জোরে এই বড় পদ বাগিয়ে নেন। ছিলেন ক্রসফায়ারে নিহত ভয়ানক সন্ত্রাসী বাবু কসাইয়ের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। বলা হয়ে থাকে, বাবু কসাইয়ের হাত ধরেই নাছিরের উত্থান।

রাজনীতিতে যেভাবে উত্থান

জাতীয় পার্টি হয়ে দীর্ঘদিন ছিলেন আওয়ামী লীগ-বিএনপির ছত্রছায়ায়। ২০০৮ সালে ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গা-ঢাকা দেন তিনি। এ সময় কিছুদিন ঢাকা ও কলকাতায় আশ্রয় নেন। কলকাতায় নাছিরের আশ্রয়দাতা ছিলেন দেশ ছেড়ে পালিয়ে আশ্রয় নেয়া মলয় বোস। পরে মলয় দেশে ফিরলে ২০১২ সালে সন্ত্রাসীদের হাতে মারা যান। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে আবার প্রকাশ্যে আসেন নাছির। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম তিন বছর তিনি সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর বড় ছেলে আয়মন আকবর চৌধুরী বাবলুর সঙ্গে দহরম-মহরম গড়ে তোলেন। ফলে তার নামে একাধিক ফৌজদারি মামলা থাকার পরও নাছিরকে গ্রেপ্তারের সাহস দেখাতে পারেনি পুলিশ। ফরিদপুরের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন মহলের বদল হলে তিনি ভোল পালটে সাবেক এলজিআরডিমন্ত্রী ও এমপি খন্দকার মোশাররফ হোসেনের গ্রুপে ভিড়ে যান।

এর আগে নাছিরের ওয়্যারলেসপাড়ার বাড়িতে ২০১১ সালে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করতে না পারলেও তার বাড়ি থেকে শতাধিক রাউন্ড বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্রের গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। অবৈধ গুলি উদ্ধারের মামলায় নাছিরের এ বছরই ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। পরে হাইকোর্ট থেকে জামিনে মুক্তি পান।

শহরকে অশান্ত করে রাখার অন্যতম কুশীলব গোলাম নাছির সম্পর্কে ফরিদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবিরুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, এই বাহিনীর উপদ্রবে ওয়্যারলেসপাড়া, গোয়ালচামট, মোল্লাবাড়ী সড়ক, পশ্চিম খাবাসপুর, রঘুনন্দনপুরসহ শহরের বড় একটি অংশ আতঙ্কে থাকত। পরিবহন সেক্টরের সব জায়গাতেই তার সন্ত্রাসীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ছিল। নাছির পালিয়ে যাওয়ার পরও তার অনুসারীরা এখনও তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও মাদক ব্যবসা অব্যাহত রেখেছে। নাছির গ্রেপ্তার হওয়ায় আমরা আশ্বস্ত, তার সহযোগীদেরও অতিদ্রুত  আইনের আওতায় আনা দরকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন....